শিক্ষকদের বিদেশ যাত্রা : সিলেটে প্রাথমিকের ১৬৩ শিক্ষকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা
সিলেটে প্রাথমিক শিক্ষকদের মধ্যে বিদেশ যাত্রার প্রবণতা বেড়েছে। গেল পাঁচ বছরে সিলেট বিভাগের অন্তত ১২ হাজারের বেশি শিক্ষক স্থায়ীভাবে বিদেশে চলে গেছেন। তবে বিদেশ যাত্রার আগে অধিকাংশ শিক্ষক নীতিমালা লঙ্ঘন করেছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। ভিসা ঠিকটাক পরবর্তী সকলেই সাধারণ ছুটি নিয়ে চলে গেছেন ইউরোপের বিভিন্ন দেশে। এর মধ্যে অনুল্লেখ যোগ্য শিক্ষক বিদেশ যাত্রার আগে চাকুরী থেকে অব্যাহতিও নিয়েছেন। অব্যাহতি না নিয়ে বিদেশ চলে যাওয়া প্রাথমিক শিক্ষকদের মধ্যে ৯০ শতাংশই নারী শিক্ষক।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিদেশ যাওয়া শিক্ষকদের অনেকেই স্টুডেন্ট ভিসা, ওয়ার্ক পারমিট আবার কেউ কেউ পরিবারের সঙ্গে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে পাড়ি জমিয়েছেন। তবে ছুটি কিংবা অব্যাহতি নিয়ে বিদেশ যাওয়ায় সংশ্লিষ্ট শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষক শুন্যতা বিরাজ করছে। এতে করে প্রাথমিক শিক্ষা এখন হুমকীতে রয়েছে। একই সাথে ওই স্কুলগুলোতে শিক্ষকও নিয়োগ করা সম্ভব হচ্ছে না।
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা গেছে,ছুটি না নিয়ে দীর্ঘদিন অনুপস্থিত থাকায় গেল ২ বছরে সিলেট জেলায় ১৬৩ জন শিক্ষকের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নিয়েছে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস। এরমধ্যে বেশিরভাগকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে ১৪০ জনের মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে। আর ২৩ জনের মামলা এখনও চলমান। শিক্ষা অফিস বলছে,কেউ কেউ ব্যক্তিগত প্রয়োজনে স্বল্পমেয়াদি ছুটি নিয়ে গোপনে বিদেশ চলে যান। এরপর মাসের পর মাস অনুপস্থিত থাকেন যারা ছুটি ছাড়া ৬০ দিনের অধিক কর্মস্থলে অনুপস্থিত তাদের বিরুদ্ধে নিয়ম অনুযায়ী বিভাগীয় মামলা রুজু করা হয়।
প্রাপ্ত তথ্য বলছে, ২০১০ সাল থেকে প্রাথমিক শিক্ষকদের মধ্যে বিদেশ যাবার প্রবণতা শুরু হয়। তবে ২০১৫ সালের পর থেকে এই প্রবণতা বেড়ে যায় তিনগুন হারে। কারন হিসেবে জানা গেছে, প্রাথমিকে নিয়োগ প্রাপ্ত অধিকাংশ শিক্ষকই রানিং স্টুডেন্ট থাকায় আইইএলটি্এসের দিকে বেশি ঝুঁকেন। স্টাডি গ্যাপ না থাকায় অধিকাংশ শিক্ষক সেই সুযোগ গ্রহণ করে বিদেশ যাত্রা নিশ্চিত করেন। তাছাড়া সিলেট প্রবাসী অধ্যুষিত অঞ্চল থাকায় অনেকেই পারিবারিক ভাবে অথবা বিয়েশাদির মাধ্যমে বিদেশে পাড়ি জমান। যারা ভ্রমণ ভিসায় বিদেশ যান, তার সেখানে গিয়ে ‘অ্যাসাইলাম’র আবেদন করে থেকে যান। এছাড়া যুক্তরাজ্যে কেয়ারগিভারসহ বিভিন্ন ধরনের কাজের ভিসায় পরিবার নিয়ে যান অনেকে। তবে যাওয়ার সময় নিয়ম অনুযায়ী কর্মস্থল থেকে ছুটি কিংবা অব্যাহতি গ্রহণের বিষয়টি কেউই আমলে নেননি।
শিক্ষা অফিসের ২১ মাসের তথ্যানুযায়ী ৬০ দিনের বেশি সময় ধরে অনুপস্থিত থাকাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি শিক্ষক রয়েছেন প্রবাসী অধ্যুষিত বিশ্বনাথ ও বিয়ানীবাজারের।
এ সময়ের মধ্যে বিশ্বনাথ উপজেলার ২৪ জন ও বিয়ানীবাজার উপজেলার ২০ জন শিক্ষক রয়েছেন। এছাড়া অন্য উপজেলাগুলোর মধ্যে সিলেট সদরের ১৬ জন, বালাগঞ্জের ১১ জন, ফেঞ্চুগঞ্জের ৪ জন, গোলাপগঞ্জের ১২ জন, জকিগঞ্জের ১৬ জন, কানাইঘাটের ৭ জন, জৈন্তাপুরের ৪ জন, গোয়াইনঘাটের ১০ জন, কোম্পানীগঞ্জের ১ জন, দক্ষিণ সুরমার ১৮ জন ও ওসমানীনগরের ২০ জন শিক্ষক রয়েছেন।
সূত্র জানায়, চাকরি থেকে ইস্তফা না দিয়ে শিক্ষকরা বিদেশ পাড়ি জমানোর কারণে অনেক স্কুলে শিক্ষক সংকট দেখা দিয়েছে। পদশূন্য না হওয়ায় এসব পদে নতুন শিক্ষক নিয়োগও দেয়া সম্ভব হচ্ছে না। ফলে স্কুলে পাঠদান ব্যহত হচ্ছে।
এ প্রসঙ্গে সিলেট জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের পরিচালক শাখাওয়াত এরশেদ জানান, যারা ছুটি ছাড়া ৬০ দিনের অধিক কর্মস্থলে অনুপস্থিত তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা রুজু করা হয়।
২০২৪-২৫ সালে এ রকম অভিযোগে ১৬৩ জনের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা হয়েছে। এরমধ্যে ১৪০টি নিষ্পত্তি হয়েছে। বাকিগুলো চলমান আছে। বিভাগীয় মামলায় অনুপস্থিত থাকা শিক্ষকদের চাকুরিচ্যুত করা হলেও জরিমানার কোনো বিধান নেই। তিনি আরও জানান, বর্তমানে সিলেট জেলায় প্রধান শিক্ষকের ৭৮৮টি ও সহকারী শিক্ষকের ৭৫০টি পদ শূন্য রয়েছে।
তাহির আহমদ
মন্তব্য করুন: