বাংলার প্রথম আধুনিক পুরুষ রাজা রামমোহন রায়
Led Bottom Ad

বাংলার প্রথম আধুনিক পুরুষ রাজা রামমোহন রায়

২৬/০৫/২০২৫ ০৮:০৩:৪৪

প্রধান উপদেষ্টা পদত্যাগ করবেন না: ফাইজ তাইয়েব আহমেদ

ছেলে বিধর্মী, তাই পৈতৃক সম্পত্তির অধিকারী যেন সে না হয় তার জন্যে মামলা করলেন মা। ছেলে প্রথমে মায়ের বিরুদ্ধে মামলা লড়তে চাইলেন না। কিন্তু পরে ঠিক করলেন, তিনি মামলা লড়বেন। কারণ ধর্মীয় গোঁড়ামির বিরুদ্ধেই তাঁর লড়াই। আর ধর্মের সাথে আইনের কোনো সম্পর্ক নেই। মামলা কোর্টে উঠল। মা তারিণী দেবী কোর্টে বিচারের সময় বললেন- "ধর্মত্যাগী পুত্রের মস্তক যদি এখানে ছিন্ন করা হয় তাহলে তা আমি অত্যন্ত পুণ্য কাজ বলে মনে করব।


আইন ধর্মের দোহাই দিয়ে চলে না। ছেলে মামলায় জয়ী হল। কিন্তু মামলায় জয়ী হওয়ার পর ছেলে তাঁর প্রাপ্ত সম্পত্তি মাকে সসম্মানে ফেরত দিয়ে দিলেন। কারণ, তাঁর যুদ্ধ মায়ের করা মামলার বিরুদ্ধে নয়, অন্যায়ের বিরুদ্ধে, সমাজের বিরুদ্ধে, ধর্মীয় গোঁড়ামি-কুসংস্কারের বিরুদ্ধে। এই ছেলে আর কেউ নন, বাংলার প্রথম আধুনিক পুরুষ রাজা রামমোহন রায়।


রামমোহনের পূর্বপুরুষ রাজ সরকারের কাজ করে ‘রায়রায়ান’ উপাধি লাভ করেছিলেন। যদিও তাঁদের কৌলিক উপাধি ছিল ‘বন্দ্যোপাধ্যায়’।  রামমোহনের প্রথম বিরোধিতার সূত্রপাত খুব সম্ভবত নিজ বাড়ি থেকেই। রামমোহন সামাজিক কুসংস্কার, ধর্মীয় গোঁড়ামির বিরুদ্ধে যখন প্রতিবাদ করছেন তখন  কলকাতা ব্রিটিশদের হাতে তৈরি হচ্ছে। 


রামমোহনের দর্শন কলকাতার মানুষজন মোটেই ভালোচোখে নেননি। কলকাতায় তখন সেই সবে ব্রাহ্মধর্মের ভিত তৈরি হচ্ছে। রামমোহন প্রায়শই ব্রাহ্মসভায় উপাসনা করতে যাচ্ছেন। কলকাতার কিছু লোক শুরু করল তাঁর গাড়ি লক্ষ্য করে ঢিল ছোঁড়া। প্রতিদিন একই ঘটনা ঘটতে লাগল। নিরুপায় রামমোহন বাধ্য হলেন বেশিরভাগ সময় গাড়ির জানালা বন্ধ করে রাখতে। 

শুধু তাই নয়, রামমোহনের বিরোধীপক্ষের তাঁর প্রাণনাশের চেষ্টা পর্যন্ত করল। আশ্চর্যের কথা, এই বিরোধীপক্ষের কেউই কিন্তু বিদেশি নয়, খাস কলকাতার 'বাঙালি'। 


রামমোহন সেল্ফ ডিফেন্সের জন্য সঙ্গে পিস্তল সঙ্গে নিয়ে বের হওয়া শুরু করলেন। রামমোহন ‘আত্মীয় সভা’ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। সপ্তাহে একদিন এই আত্মীয় সভা অনুষ্ঠিত হত। সেখানে বেদান্ত অনুযায়ী এক ব্রহ্মের উপাসনা এবং পৌত্তলিকতার বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার কথা বলা হত। সভায় বেদপাঠের পর ব্রাহ্মসঙ্গীত গাওয়া হত। সভা সকলের জন্যে উন্মুক্ত ছিল না, কেবলমাত্র রামমোহনের কয়েক জন বন্ধু তাতে যোগদান করতেন। 


 ইংরেজি বেদান্ত গ্রন্থের ভূমিকায় রামমোহন লিখলেন – “আমি ব্রাহ্মণ বংশে জন্মগ্রহণ করে বিবেক ও সরলতার আদেশে যে পথ অবলম্বন করেছি তাতে আমার প্রবল কুসংস্কারাচ্ছন্ন আত্মীয়গণের তিরস্কার ও নিন্দার পাত্র হতে হল। কিন্তু যাই হোক না কেন, আমি এই বিশ্বাসে ধীরভাবে সমস্ত কিছু সহ্য করতে পারি যে, একদিন  আসবে, যখন আমার এই সামান্য চেষ্টা লোকে ন্যায় দৃষ্টিতে দেখবে।”


রামমোহনের বই ও বইয়ের অনুবাদের ফলে দেশে বিদেশে রামমোহনের নাম ছড়িয়ে পড়ল। লন্ডন, ফ্রান্স, আমেরিকায় রামমোহন জনপ্রিয় হয়ে উঠলেন। অন্যদিকে নিজ দেশের বাঙালিরা রামমোহনের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ শুরু করল। রামমোহন-বিরোধী অন্দোলন ব্যাপক আকার ধারণ করল। এরই মধ্যে রামমোহন যীশুখ্রিস্টের উপদেশ -'শান্তি সুখের পথ' ইংরাজিতে- 'Precepts of Jesus-Guide to Peace and Happiness' নামে একটি গ্রন্থ রচনা করেন। 


 এতদিন রামমোহন হিন্দু সমাজ ও ধার্মিকদের সাথে বিবাদে জড়িয়ে ছিলেন, এই বই প্রকাশের পর এবার খ্রিস্টান পাদ্রীদের বিরোধিতার সম্মুখীন হলেন। মিশনারি পাদ্রী উইলিয়াম কেরি ও মার্শম্যান সাহেবও এই বইয়ের বিরোধিতা করলেন। 

ইংরেজি সাপ্তাহিক পত্রিকা “ফ্রেন্ড অব ইন্ডিয়া”য় তীব্র ভাষায় প্রতিবাদ করলেন কেরি ও মার্শম্যান। তাঁদের বক্তব্য, রামমোহন যীশুর উপদেশ মান্য করেছেন ঠিক কথা, কিন্তু প্রভু যীশুর অলৌকিক ঘটনাগুলোকে অস্বীকার করেছেন।  এই নিয়ে উভয়পক্ষের বিরোধ চরমে উঠল।


এতদিন ধরে ব্যাপটিস্ট মিশন প্রেস রামমোহনের সমস্ত বই ছাপতেন। খ্রিস্টানরা বিরোধিতা করার ফলে ব্যাপটিস্ট মিশন প্রেস রামমোহনের নতুন বই 'Final Appeal' ছাপাতে অস্বীকার করল। কিন্তু মানুষটির নাম রামমোহন রায়। যিনি হারতে শেখেননি। রামমোহন নিজেই ‘ইউনিটেরিয়ান প্রেস’ নামে একটি প্রেস নির্মাণ করলেন। আর সেই প্রেস থেকে 'Final Appeal' বইটি ছাপা হল। রামমোহনের শেষ এই গ্রন্থে তাঁর মেধা ও পাণ্ডিত্য দেখে সবাই অবাক হয়ে গেল। 


সতীদাহের বিরুদ্ধে প্রথম রামমোহন একটি গ্রন্থ রচনা করেন এবং তার ইংরেজি অনুবাদও প্রকাশ করেন। তিনি প্রমাণ করে দেখান যে এই প্রথা শাস্ত্রবিরোধী। রামমোহনের এসব কর্মকাণ্ডের ফলে গোঁড়া রক্ষণশীল হিন্দু সমাজ আবার তাঁর বিরুদ্ধে খড়্গহস্ত হল। তাঁকে মেরে ফেলার জন্য আবার ষড়যন্ত্র শুরু হল।


রামমোহন সতীদাহ নিয়ে শুধু বই লিখেই থেমে থাকলেন না কিংবা ইংরেজদের এই প্রথার বিরুদ্ধে আইন করার জন্যে আবেদন করেই বসে থাকলেন না। তিনি নিজের বন্ধুদের নিয়ে একটি দল গঠন করলেন। তাঁরা সতীদাহ বন্ধ করার জন্যে বিভিন্ন শ্মশানে ছুটে যেতেন। মানুষকে এই প্রথার বিরুদ্ধে বোঝাতেন। চেষ্টা করতেন এই প্রথা বন্ধের। আর এই কাজ করতে গিয়ে তাঁকে প্রতিনিয়ত অনেক লাঞ্ছনা, অপমান ভোগ করতে হল। তারপরও তিনি থেমে থাকেননি। লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্ক পূর্বেই রামমোহন ও তাঁর দলের সমর্থন লাভ করেছিলেন। সতীদাহ প্রথা নিষেধ করে ইংরেজ সরকার আইন জারি করলেন। 


গোঁড়া হিন্দু সমাজ সতীদাহ রদ আইনে বাতিল করার জন্যে সবাই একজোট হল। তারা বিলেতের পার্লামেন্টে অবধি আপিল করে বসল। ইংল্যান্ডের ধর্মসভায় সেই আপিল অগ্রাহ্য হল। শেষ অবধি রামমোহনই জিতলেন। রামমোহন নারীর সম্পত্তি লাভের জন্যে আন্দোলন শুরু করলেন।  কলকাতার রক্ষণশীল সমাজ আবার রামমোহনের প্রাণনাশের চেষ্টা করল। কিন্তু রামমোহন মরিয়া। এই আইনও তিনি পাশ করালেন।


রামমোহনের জীবনের শেষ তিন বছর কেটেছিল ইংল্যান্ডে। বিলেত যাওয়ার আগে তিনি দিল্লির বাদশাহের কাছ থেকে 'রাজা' উপাধি লাভ করেন। ঊনষাট বছর বয়সে বিদেশের মাটিতেই মারা যান ভারতের প্রথম আধুনিক পুরুষ। মৃত্যুর আগে খ্রিস্টান সমাধিস্থলে তাকে সমাহিত না করার জন্য তিনি অনুরোধ করেছিলেন। যে-কারনে পরে তাঁকে স্টাপেল গ্রোভ-এর নির্মাণস্থানে সমাহিত করা হয়।


মীর্জা ইকবাল

মন্তব্য করুন:

Led Bottom Ad
Led Bottom Ad
Led Bottom Ad