হাওরের রক্ষাকবচ সাবাড়: ফতেপুরে গাছ খেকোদের দৌরাত্ম্য, নীরব প্রশাসন!
মাছের কৃত্রিম অভয়ারণ্য (কৌড়) তৈরির অজুহাতে সুনামগঞ্জের বিশম্ভরপুর উপজেলার ফতেপুর ইউনিয়নের হরিপুর গ্রামে চলছে এক ধ্বংসযজ্ঞ। ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের এই গ্রামে জলাশয়ের প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষা করা ৪ একর বাগানের সারি সারি বহুবর্ষজীবী হিজল গাছ কেটে সাবাড় করছে একদল অসাধু চক্র। ফলে মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে স্থানীয় পরিবেশ, প্রতিবেশ ও হাওরের বাস্তুতন্ত্র।
গত ১৩ সেপ্টেম্বর (রবিবার) সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বাগানটি থেকে গোড়াসহ উপড়ে ফেলা প্রায় ৬২টি বিশাল হিজল গাছ বিলের পানিতে ফেলার উদ্দেশ্যে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। গাছ কেনার বিষয়টি স্বীকার করে ক্রেতা নূরজামাল জানান, জলাশয়ে ফেলার জন্য পাঁচহিস্যা গ্রামের আব্দুর রহিম এবং হরিপুর গ্রামের মিহির রঞ্জন দাস ও সমীর রঞ্জন দাস গংদের কাছ থেকে ১ লাখ ২০ হাজার টাকায় তিনি এসব গাছ কিনেছেন। প্রতি বছরই তিনি এভাবে বিভিন্ন স্থান থেকে হিজল গাছ কিনে থাকেন বলে নির্দ্বিধায় জানান।
পরিবেশ ধ্বংসের এ কর্মকাণ্ডে বিন্দুমাত্র অনুসূচনা নেই বিক্রেতা মিহির রঞ্জন দাসের। মালিকানার দোহাই দিয়ে উদাসীন কণ্ঠে তিনি বলেন, "আমরা আমাদের রেকর্ডীয় জায়গায় গাছ বিক্রি করেছি। এখানে আমাদের জবাবদিহিতার কী আছে?"
তবে ব্যক্তিমালিকানাধীন জায়গা হলেও এভাবে ঢালাওভাবে হাওরের বৃক্ষনিধন সম্পূর্ণ বেআইনি। পরিবেশ বিশেষজ্ঞ ও আইনের সংশ্লিষ্ট ধারায় স্পষ্ট বলা হয়েছে, হিজল ও করচ গাছ হাওরাঞ্চলের জলজ প্রাণী ও দেশি পাখির প্রধান আশ্রয়স্থল। জীবিত গাছ কেটে ফেলা হলে মাছের স্বাভাবিক প্রজনন ব্যাহত হয়, আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ে ভূমি ক্ষয় এবং তাপমাত্রা। বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫ (সংশোধিত ২০১০) আইনের ধারা ৬(খ) অনুযায়ী বাস্তুতন্ত্রের জন্য গুরুত্বপূর্ণ জলজ বন ধ্বংস করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।
তাছাড়া, বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন, ২০১২ ও ফরেস্ট অ্যাক্ট, ১৯২৭ এ বলা আছে স্পর্শকাতর হাওর এলাকায় গাছ কাটার আগে বন অধিদপ্তরের ছাড়পত্র নেওয়া বাধ্যতামূলক। আইনের তোয়াক্কা না করে আশ্রয়স্থল ধ্বংস করলে কারাদণ্ড, অর্থদণ্ড এবং অবৈধ বনজ সম্পদ জব্দের পরিষ্কার বিধান রয়েছে।
এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে সুনামগঞ্জ জেলা বন অফিসের রেঞ্জ কর্মকর্তা মোঃ রিয়াজ উদ্দিন জানান, "ব্যক্তিমালিকানাধীন হলেও হাওর অঞ্চলে পরিবেশের প্রভাব বিবেচনা না করে গাছ কাটা আইনত অপরাধ। সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে আমরা দ্রুত ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে তদন্ত সাপেক্ষে দোষীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেব এবং কাটা গাছ উদ্ধার করব।"
অসাধু চক্রের এমন ঔদ্ধত্য ও মালিকানার দোহাই মানতে নারাজ স্থানীয় পরিবেশ সচেতন মহল। হরিপুর গ্রামের অবশিষ্টাংশের গাছগুলো রক্ষা করা এবং এই পরিবেশ বিধ্বংসী চক্রকে দ্রুত আইনের আওতায় আনতে উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) ও জেলা বন অধিদপ্তরের জরুরি হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন তারা।
প্রীতম / আর আর
মন্তব্য করুন: