শাহ আরেফিন টিলা বিলীন, আছে শুধু নাম—চলছে চাঁদাবাজি
Led Bottom Ad

শাহ আরেফিন টিলা বিলীন, আছে শুধু নাম—চলছে চাঁদাবাজি

তাহির আহমদ

০৭/০১/২০২৬ ২২:১৭:০৬

প্রধান উপদেষ্টা পদত্যাগ করবেন না: ফাইজ তাইয়েব আহমেদ

সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার পশ্চিম ইসলামপুর ইউনিয়নের ঝালিয়ার পাড় গ্রামে একসময় ১৩ একর জায়গাজুড়ে বিস্তৃত ছিল শাহ আরেফিন টিলা। স্থানীয়ভাবে বিশ্বাস করা হয়, এই টিলার সঙ্গে জড়িয়ে আছে হযরত শাহ আরেফিন (রহ.)-এর স্মৃতি। তবে এখন সেখানে আর কোনো টিলা নেই। নেই তাঁর কোনো স্থাপনা কিংবা স্মৃতিচিহ্ন। পুরো এলাকা পরিণত হয়েছে অসংখ্য গভীর গর্তে।


প্রচলিত মতে, হযরত শাহ আরেফিন (রহ.) আরব বা মধ্য এশিয়া থেকে ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে উপমহাদেশে আসেন। হযরত শাহ জালাল (রহ.) ও তাঁর সঙ্গীদের আগমনের পর সিলেট অঞ্চল সুফি সাধকদের জন্য পরিচিত হয়ে ওঠে। সেই ধারাবাহিকতায় শাহ আরেফিন (রহ.) কোম্পানীগঞ্জ এলাকায় এসে একটি টিলার ওপর নির্জন স্থানে অবস্থান নেন এবং সেখানে একটি খানকাহ বা আস্তানা গড়ে তোলেন বলে স্থানীয়দের ধারণা। তবে সময়ের ব্যবধানে সেই আস্তানা বিলুপ্ত হয়েছে। বর্তমানে তার কোনো অস্তিত্ব নেই।


স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে নির্বিচারে বালু ও পাথর উত্তোলনের ফলে শাহ আরেফিন টিলার বিশাল অংশ ধসে পড়ে। সর্বশেষ গত ৫ আগস্টের পর পুরো টিলাভূমিই বিলীন হয়ে যায়। টিলার পাশে অবস্থিত একটি মসজিদও এখন ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। মসজিদটি থাকলেও টিলা ধসের আশঙ্কায় সেখানে মুসল্লিরা নামাজ পড়তে আসছেন না।


সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো—শাহ আরেফিন (রহ.)-এর কোনো মাজার বা স্থাপনা বাস্তবে না থাকলেও তাঁর নাম ব্যবহার করে চলছে চাঁদাবাজি। স্থানীয় সূত্র জানায়, ‘শাহ আরেফিন শাহ (র.) মাজার’ নামে একটি কমিটি দেখিয়ে প্রায় এক যুগ ধরে চাঁদা আদায় করা হচ্ছে। মাজারের নামে খাদেমও রয়েছে, অথচ সেখানে মাজারের কোনো অস্তিত্ব নেই।


মাজারের সর্বশেষ খাদেম হিসেবে দায়িত্ব পালন করা আনোয়ার হোসেন আনাই বলেন, ২০১৯ সালের শেষ দিকে স্থানীয় এলাকাবাসী তাঁকে স্মৃতি রক্ষার উদ্দেশ্যে খাদেম হিসেবে নিয়োগ দেন। তিনি ২০২২ সালের শুরুর দিকে দায়িত্ব পালন বন্ধ করেন। তাঁর দাবি, মাজারের নামে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ সঠিক নয়, এটি হয়তো কোনো পক্ষের অপপ্রচার।


ঝালিয়ার পাড় গ্রামের সাবেক ইউপি সদস্য সানুর আলী জানান, প্রথমে সরকারি লিজের মাধ্যমে বশির অ্যান্ড কোম্পানির হাত ধরে টিলা কাটা শুরু হয়। পরে হাইকোর্টের নিষেধাজ্ঞার কারণে কার্যক্রম বন্ধ হলেও প্রশাসন ও রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে এখনও বালু-পাথর লুট অব্যাহত রয়েছে।


টিলাভূমি ধ্বংশযজ্ঞের নেপথ্যে রয়েছেন মাজারের বিগত খাদেমরা। এমন তথ্য জানিয়ে স্থানীয়রা জানান, ঝালিয়ার পাড় নিবাসী মৃত ফকির আবদুল মনাফ ছিলেন শাহ আরেফিন মাজারের খাদেম। পরবর্তীতে তাঁর মেয়ে মৃত জাহানারা বেগম দুই মেয়াদে মাজারের খাদেমের দায়িত্ব পালন করেন। জাহানার বেগমের পর তারই ছেলে মনির মিয়াও খাদেমের দায়িত্ব পালন করেন। তাদের হাত ধরেই মূলত বিস্তৃত টিলাভূমি থেকে বালু-পাথর লুট করা হয় বিরামহীন ভাবে। বিচ্ছিন্নভাবে আরও যাদের নাম পাওয়া গেছে-তারা হলেন,উপজেলা যুবদলের যুগ্ম আহবায়ক বাবুল মিয়া,আওয়ামী লীগ নেতা কালা মিয়া,আবদুর রহিম। 


এদিকে শাহ আরেফিন সংলগ্ন ছনবাড়ি সোনাই নদী থেকে চলে বালু উত্তোলন। উত্তোলিত বালু ট্রাক্টরযোগে পাচার হলে সেখানেও চলে গাড়ি প্রতি একশো থেকে দেড়শো টাকা চাঁদাবাজি। এভাবে প্রতিদিন দুই থেকে আড়াইশো বালুবাহী ট্রাক্টর থেকে টাকা আদায় করেন উপজেলা যুবদল নেতা সোনা মিয়া এবং আনা মিয়ার লোকজন। আবার স্থানীয় আজির মেম্বারের বাড়ি থেকে পাথরবাহী গাড়ি থেকে একশো থেকে দেড়শো টাকা করে চাঁদা আদায় করেন মানিক ও সোনা মিয়ার লোকজন।


এ বিষয়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকে কার্যকর পদক্ষেপ না থাকায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয়রা। তাঁদের প্রশ্ন—একজন সুফি সাধকের স্মৃতিবিজড়িত স্থান ধ্বংস হয়ে গেলেও কেন কেউ দায় নিচ্ছে না।


কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ রবিন মিয়া বলেন, সত্যিকার অর্থে-এই এলাকার সকলেই কোন না কোন ভাবে চাঁদাবাজির সাথে জড়িত। যেমন কারো বাড়ির সামনে টিলা কাটা হচ্ছে, কারো বাড়ির রাস্তা দিয়ে বালু-পাথরবাহী ট্রাক যাচ্ছে,আবার কেউবা রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী। এদের সকলে যদি সুযোগ না দিতো-তাহলে প্রকৃতির এই স্বর্গরাজ্য আজ বিরানভূমিতে পরিণত হতো না। তিনি বলেন. অভিযোগ থাকলেও যাতাযাত ব্যবস্থার কারণে সেখানে সব সময় অভিযান চালানো সম্ভব হয় না। আবার অভিযান চলাকালে সাময়িক বন্ধ হলেও রাতের আঁধারে ফের লুটপাট চলে। 


কোম্পানীগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) শফিকুল ইসলাম খান বলেন, এড়িয়াটি মূলত খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের। সুতরাং থানা প্রশাসন এককভাবে এখানে কিছুই করতে পারে না। তবে সমন্বিত উদ্যো্গ গ্রহণ করা হলে অবশ্যই থানা পুলিশ সহযোগীতার হাত বাড়িয়ে দিতে প্রস্তুত রয়েছে। তিনি বলেন, আমরা চাই মন্ত্রণালয় কিংবা তাঁর প্রতিনিধিগন এ ব্যাপারে আশু পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরী। 


তাহির আহমদ

মন্তব্য করুন:

Led Bottom Ad
Led Bottom Ad