হতাশ পর্যটক ও প্রকৃতিপ্রেমীরা
মৌলভীবাজারের বাইক্কা বিলে কমছে পরিযায়ী পাখি
একসময় শীত মৌসুম এলেই মৌলভীবাজারের সংরক্ষিত বাইক্কা বিল হয়ে উঠত পরিযায়ী পাখির নিরাপদ আশ্রয়স্থল। ঝাঁকে ঝাঁকে পাখির আগমনে কিচিরমিচিরে মুখর থাকত পুরো এলাকা। দেশি-বিদেশি পর্যটক ও গবেষকদের আনাগোনায় প্রাণচাঞ্চল্য ফিরত হাইল হাওরে। তবে সেই চিত্র এখন অনেকটাই অতীত।
বর্তমানে বাইক্কা বিলে আগের মতো পরিযায়ী পাখির দেখা মিলছে না। পাখি দেখতে এসে হতাশ হয়ে ফিরে যাচ্ছেন পর্যটকরা। পরিবেশবিদ ও পাখি গবেষকদের মতে, জলজ উদ্ভিদ হ্রাস, আবাসস্থল ধ্বংস, জলবায়ু পরিবর্তন এবং নির্বিচারে শিকারের কারণেই পরিযায়ী পাখির সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে।
মৌলভীবাজার সদর, শ্রীমঙ্গল উপজেলা এবং হবিগঞ্জ জেলার বাহুবল উপজেলার বিস্তৃত অঞ্চলজুড়ে বিস্তৃত হাইল হাওরের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো বাইক্কা বিল। একসময় এই বিল নানান রঙ ও প্রজাতির পরিযায়ী পাখির জন্য সুপরিচিত ছিল। এখন পরিযায়ী পাখি না এলেও কিছু দেশি প্রজাতির পাখি দেখা যায়, তবে সংখ্যায় তা খুবই কম।
পাখি গবেষকদের মতে, মৎস্য আহরণের জন্য বিল থেকে কচুরিপানা, শাপলা-শালুকসহ জলজ উদ্ভিদ সরিয়ে ফেলায় পাখির খাবার ও বসার জায়গা নষ্ট হয়েছে। এছাড়া হাওরের গাছপালা কমে যাওয়া, অপরিকল্পিত ভরাট, সেচ ও বিষ প্রয়োগের মাধ্যমে মাছ নিধন, নিষিদ্ধ জাল ব্যবহার, নির্বিচারে পাখি শিকার এবং হাওরের ভেতর দিয়ে যানবাহন চলাচল পাখির আবাসস্থলকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
উল্লেখ্য, জীববৈচিত্র্য রক্ষায় ২০০৩ সালের ১ জুলাই ১০০ হেক্টর জলাভূমিকে ভূমি মন্ত্রণালয় ‘বাইক্কা বিল অভয়াশ্রম’ ঘোষণা করে। সে সময় মাছ ধরা ও জলজ উদ্ভিদ আহরণ নিষিদ্ধ করা হলেও বাস্তবে পাখি শিকার ও পরিবেশ ধ্বংস পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা যায়নি। ফলে একসময় যে বিলে বালিহাঁস, গিরিয়া হাঁস, ভুতিহাঁস, পানকৌড়ি, বাটান, বক, শকুন, চিলসহ অসংখ্য দেশি-বিদেশি পাখির অবাধ বিচরণ ছিল, এখন তার বেশিরভাগই অনুপস্থিত।
বর্তমানে বিলের আশপাশে শালিক, ঘুঘু, দোয়েল, চড়ুই, বুলবুলি, টুনটুনি ও দাগি ঘাসপাখিসহ কিছু সাধারণ দেশি পাখির দেখা মিলছে।
পরিবেশকর্মী আহাদ মিয়া বলেন, “গত কয়েক বছরে বাইক্কা বিলে পরিযায়ী পাখি কমে যাওয়ার মূল কারণ জলজ ও স্থলজ পরিবেশের অবক্ষয়। মানুষের অসচেতন কর্মকাণ্ড ধীরে ধীরে জীববৈচিত্র্যকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। পরিযায়ী পাখি রক্ষায় এখনই কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।”
বাইক্কা বিলের দায়িত্বে থাকা বড়গাঙ্গিনা সম্পদ ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি মিন্নত আলী বলেন, “কয়েক বছর আগেও এখানে প্রচুর পাখি ছিল। কিন্তু জলজ উদ্ভিদের অভাব, নিষিদ্ধ কারেন্ট জাল দিয়ে শিকার ও সেচ মেশিন ব্যবহারের কারণে পাখি কমে যাচ্ছে। তবে এখনও শীত মৌসুম পুরোপুরি আসেনি, সামনে কিছু পাখি আসার সম্ভাবনা রয়েছে।”
বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগ সিলেটের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. আবুল কালাম বলেন, “হাওরের গভীরতা আগের তুলনায় অনেক কমে গেছে। যেখানে একসময় সারা বছর পানি থাকত, এখন সেখানে কয়েক মাসই পানি থাকে। মানুষের চলাচল বেড়ে যাওয়াসহ বিভিন্ন কারণেও পরিযায়ী পাখির আগমন কমে যেতে পারে।”
প্রকৃতিপ্রেমীরা বলছেন, বাইক্কা বিলের জীববৈচিত্র্য রক্ষা ও পরিযায়ী পাখির ফিরিয়ে আনতে হলে কঠোরভাবে শিকার বন্ধ, জলজ উদ্ভিদ সংরক্ষণ এবং হাওরের স্বাভাবিক পরিবেশ পুনরুদ্ধারে জরুরি পদক্ষেপ নিতে হবে।
এ রহমান
মন্তব্য করুন: