যে কোনো দুর্ঘটনা বা দুর্যোগে প্রাণহানি ও ক্ষতি কমাতে সামনের সারিতে কাজ করেন ফায়ার অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্স সার্ভিসের কর্মীরা। নির্ধারিত এলাকা অনুযায়ী প্রতিটি স্টেশনের কার্যক্রম পরিচালিত হলেও জরুরি পরিস্থিতিতে একাধিক স্টেশন সম্মিলিতভাবেও কাজ করে থাকে। তবে সিলেটের বিয়ানীবাজারে ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের সক্ষমতা সীমিত থাকায় দীর্ঘদিন ধরেই কাঙ্ক্ষিত সেবা পাওয়া নিয়ে ভোগান্তির অভিযোগ রয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চাহিদা অনুযায়ী পর্যাপ্ত লজিস্টিক সহায়তা না থাকা, জনবল সংকট এবং সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থার জটিলতার কারণে অনেক সময় ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও প্রয়োজনীয় সেবা দিতে পারছে না বিয়ানীবাজার ফায়ার অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্স সার্ভিস।
যে কোনো ধরনের দুর্ঘটনা মোকাবিলা কিংবা বহুতল ভবনে উদ্ধার অভিযানে বিয়ানীবাজার ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের কার্যকর সক্ষমতা সর্বোচ্চ ৩০ ফুট পর্যন্ত। অথচ প্রবাসী অধ্যুষিত এই উপজেলায় পৌরশহর, শহরতলীসহ বিভিন্ন এলাকায় ৫০ ফুটের বেশি উচ্চতার অসংখ্য বহুতল ভবন গড়ে উঠেছে। শুধু পৌর এলাকাতেই রয়েছে অন্তত ১৩৫টি এমন ভবন।
অভিযোগ রয়েছে, দেশের অন্যতম ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত বিয়ানীবাজারে ফায়ার সার্ভিসের সক্ষমতা বিবেচনায় না নিয়েই এসব বহুতল ভবনের অনুমোদন দিয়েছে পৌরসভা।
সূত্র জানায়, পৌর এলাকায় ভবন নির্মাণের অনুমোদনের জন্য নির্ধারিত কমিটি থাকা বাধ্যতামূলক হলেও ২০২৫ সালের এপ্রিলের আগ পর্যন্ত বিয়ানীবাজার পৌরসভায় এ ধরনের কোনো কমিটি ছিল না। এই সময়ের মধ্যে পৌর প্রশাসক, মেয়র, সচিব ও প্রকৌশলীদের স্বাক্ষরে যে অনুমতিপত্র দেওয়া হয়েছে, তাতে পৌরসভার ভবন নির্মাণ নীতিমালা অনুসরণ করা হয়নি। অভিযোগ রয়েছে, দুই দশকের বেশি সময় ধরে দায়িত্বশীলরা নিজস্ব ক্ষমতা প্রয়োগ করে ভবন নির্মাণের অনুমতি দিয়ে আসছেন।
২০১৩ সালে স্থাপিত বিয়ানীবাজার ফায়ার অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্স সার্ভিস একটি সি-গ্রেড স্টেশন। উন্নয়ন না হওয়ায় মাত্র ১০ জন জনবল দিয়ে প্রায় পাঁচ লাখ মানুষের সেবা দিতে হচ্ছে দমকল বাহিনীকে।
নিয়ম অনুযায়ী ৫০ ফুট বা এর বেশি উচ্চতার ভবন নির্মাণে ফায়ার সার্ভিসের অনুমোদন, ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবস্থা, লিফট সংযোগ এবং জরুরি বহির্গমন পথ থাকা বাধ্যতামূলক। তবে বাস্তবে বহু ভবনেই এসব নির্দেশনার কোনোটি মানা হয়নি। কোথাও লিফট থাকলেও নেই পানির জোগান কিংবা জরুরি সিঁড়ি।
বিয়ানীবাজার ফায়ার অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্স সার্ভিসের ভারপ্রাপ্ত স্টেশন কর্মকর্তা সুকুমার সিংহ জানান, তাদের স্টেশনে রয়েছে মাত্র একটি অগ্নিনির্বাপণ যান, যার পানি ধারণক্ষমতা ১ হাজার ৮০০ লিটার। পর্যাপ্ত জলাশয় না থাকায় নিয়মিত পাম্প ওয়েস্ট টেস্টও করা যাচ্ছে না। অগ্নিকাণ্ডের সময় জরুরি পানির জোগান পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
তিনি বলেন, “৩০ ফুটের বেশি উচ্চতার কোনো ভবনে দুর্ঘটনা ঘটলে আমাদের পক্ষে সেখানে উদ্ধার কার্যক্রম চালানো সম্ভব নয়।” একটি প্রায় ৬০ ফুট উঁচু ভবনের দিকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, এসব ভবন নীতিমালা অনুসরণ না করেই নির্মাণ করা হয়েছে এবং ফায়ার সার্ভিসের অনুমোদনও নেওয়া হয়নি।
পৌরসভা সূত্রে জানা গেছে, বিয়ানীবাজার পৌরশহর ও শহরতলী এলাকায় দুইতলা ভবন রয়েছে ২২৪টি, তিনতলা ১৪৫টি, চারতলা ৫২টি, পাঁচতলা ১১৮টি, ছয়তলা ১০টি এবং সাততলা ভবন রয়েছে সাতটি। আবাসিক এলাকাতেও রয়েছে একাধিক সাততলা ভবন।
বিয়ানীবাজার পৌরসভার সাবেক প্রশাসক ও সদ্য বিদায়ী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা গোলাম মুস্তফা মুন্না বলেন, “২০০১ সালে পৌরসভা স্থাপিত হলেও ২০২৫ সালের আগে এখানে ভবন নির্মাণ নীতিমালা ছিল না। ফলে বহুতল ভবন নির্মাণে যেসব নিয়ম মানার কথা, সেগুলো অনুসরণ করা হয়নি।”
তিনি আরও বলেন, “ভবনের চারপাশে খালি জায়গা রাখা হয়নি, জরুরি বহির্গমন পথ নেই, আগুন লাগলে পানির ব্যবস্থা নেই—এমনকি অনেক ভবনে লিফটও নেই।”
ফায়ার সার্ভিস সূত্র জানায়, ত্রুটিপূর্ণ ভবন চিহ্নিত করে সেগুলোকে নিয়মের আওতায় আনতে ভবন মালিকদের জন্য করণীয় নির্ধারণ করা হবে। ২০২৫ সালের এপ্রিলে ভবন নির্মাণ কমিটি গঠনের পর ১১টি ভবন ও তিনটি মার্কেটের নকশা জমা পড়লেও নিয়ম না মানায় সেগুলোর অনুমোদন দেওয়া হয়নি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দ্রুত ফায়ার সার্ভিসের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং ভবন নির্মাণে কঠোর নজরদারি না করা হলে বিয়ানীবাজারে বড় ধরনের দুর্ঘটনার ঝুঁকি থেকেই যাবে।
মন্তব্য করুন: