শীতের সকালে আখের রসের ঘ্রাণে মুখর যে গ্রাম
Led Bottom Ad

হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্য আঁকড়ে বেঁচে আছে মিঠিপুরে

শীতের সকালে আখের রসের ঘ্রাণে মুখর যে গ্রাম

প্রথম সিলেট প্রতিবেদন

৩০/১২/২০২৫ ১২:১০:০৯

প্রধান উপদেষ্টা পদত্যাগ করবেন না: ফাইজ তাইয়েব আহমেদ

শীতের সকালে আখের রসে মুখ ভেজানোর গ্রামীণ ঐতিহ্য এখন প্রায় বিলুপ্ত। একসময় যে দৃশ্য ছিল শীতের অবিচ্ছেদ্য অনুষঙ্গ, আজ তা কেবল স্মৃতির পাতায়। তবে সময়ের স্রোতে হারিয়ে যেতে বসা সেই ঐতিহ্যের শেষ আলোটুকু এখনো জ্বলে আছে মৌলভীবাজার জেলার রাজনগর উপজেলার প্রত্যন্ত মিঠিপুর গ্রামে।

একসময় শীত এলেই মিঠিপুরে জমে উঠত আখ মাড়াই উৎসব। গ্রামের মাঠের এক কোণে মহিষের টানে ঘুরত আখ মাড়াই কল। পুরুষরা করতেন আখ মাড়াইয়ের কাজ, আর নারীরা বড় হাঁড়িতে জ্বাল দিতেন আখের রস। সেই রস থেকেই তৈরি হতো সুস্বাদু লালিগুড়। চারপাশে ছড়িয়ে পড়ত গুড়ের মিষ্টি ঘ্রাণ, যা শীতের সকালের সঙ্গে মিশে এক অনন্য আবহ তৈরি করত।

কিন্তু সময় বদলেছে। আধুনিকতার ছোঁয়ায় সেই সোনালি দিনগুলো অনেকটাই হারিয়ে গেছে। মহিষের টানে আখ মাড়াই এখন আর দেখা যায় না, জায়গা করে নিয়েছে ডিজেলচালিত পাওয়ার মেশিন। নেই আগের মতো সকালের ব্যস্ততা, নেই কিশোরদের দল বেঁধে রস খাওয়ার আনন্দ। গ্রামীণ কৃষ্টি ও মানুষের আত্মিক বন্ধনের সেই চিত্র আজ ম্লান হয়ে গেছে সময়ের স্রোতে। তবু গ্রামের বয়োজ্যেষ্ঠরা এখনো স্মৃতিচারণ করেন আখ, গুড় আর রসের সেই প্রাণবন্ত দিনগুলোর কথা।

রাজনগরের টেংরাজার ইউনিয়ন থেকে মনু নদ পাড়ি দিয়ে নৌকায়, এরপর মেঠোপথ ধরে হাঁটলেই ধীরে ধীরে বদলে যেতে থাকে চারপাশের দৃশ্য। এই পথ এসে মিশেছে কামারচাঁক ইউনিয়নের মিঠিপুর গ্রামে—যেখানে এখনো টিকে আছে আখ মাড়াইয়ের প্রাচীন ঐতিহ্যের শেষ চিহ্ন।

এ গ্রামে ভোরের আলো ফোটার আগেই মাঠে নামেন চাষিরা। সূর্য ওঠার আগেই খেত থেকে কাটা আখ মাড়াই করে সংগ্রহ করা হয় রস। এরপর শুরু হয় ব্যস্ততা—কেউ রস বিক্রি করছেন, কেউ আবার হাঁড়িতে জ্বাল দিয়ে তৈরি করছেন লালিগুড়।

সরেজমিনে কয়েকজন আখ চাষির সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, একসময় মিঠিপুর গ্রামের শতাধিক পরিবার আখ চাষের সঙ্গে জড়িত থাকলেও বর্তমানে টিকে আছে মাত্র ৫ থেকে ৭টি পরিবার। চাষিরা জানান, আখ চাষ লাভজনক হলেও উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় এবং আধুনিক মাড়াই যন্ত্রের অভাবে অনেকেই এ পেশা ছেড়ে দিয়েছেন। তবে লাভের সম্ভাবনা থাকায় মনু নদপাড়ের কিছু চাষি নতুন করে আখ চাষে আগ্রহী হচ্ছেন।

মিঠিপুর গ্রামের পঞ্চাশোর্ধ্ব আখ চাষি সিরাজুল ইসলাম গেন্দু বলেন,‘প্রায় ৩৫ বছর ধরে আমি আখ চাষ করছি। বাবার পর আমি এ চাষ ধরে রেখেছি। এখন যতদিন বাঁচি, ততদিন পূর্বপুরুষদের এই ব্যবসা ধরে রাখব।’

তিনি জানান, বহুদিন ধরেই মিঠিপুরে আখ চাষ হয়ে আসছে। এখানকার আখের রস অত্যন্ত মিষ্টি হওয়ায় গ্রামের নামকরণ হয়েছে ‘মিঠিপুর’। বর্তমানে তিনি তিন কিয়ার জমিতে আখ চাষ করে প্রায় ৫০ হাজার টাকা খরচ করেছেন। এরই মধ্যে এক লাখ টাকার আখ বিক্রি করেছেন এবং আরও দেড় লাখ টাকা বিক্রির আশা করছেন। প্রায় ২০ বছর ধরে তিনি মহিষের পরিবর্তে যন্ত্র দিয়ে আখ মাড়াই করছেন। নিজের খেতের আখের পাশাপাশি ভাড়ায় অন্যদের আখও মাড়াই করে দেন তিনি।

আখ চাষিরা আরও জানান, ডিসেম্বর মাসের শুরু থেকেই এখানে আখ মাড়াই শুরু হয়। ভোরবেলা আখ মাড়াই শেষে সকালে বিভিন্ন এলাকার পাইকাররা খুচরা বিক্রির জন্য আখের রস নিতে আসেন। রস দেওয়ার পর বাড়তি রস বড় হাঁড়িতে জ্বাল দিয়ে তৈরি করা হয় গুড় ও তরল লালি। এসব পণ্য বাড়ি থেকেই পাইকাররা নিয়ে যান, আবার অনেক সময় গ্রাহকের চাহিদা অনুযায়ী হাট বা নির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছে দেওয়া হয়। বর্তমানে প্রতি লিটার আখের রস ৬০ টাকা, প্রতি কেজি গুড় ২৫০ টাকা এবং লালির কেজি ২২০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।

প্রবীণ শিক্ষক আব্দুল আজিজ বলেন,‘এ জনপদের শীতের সকাল মুখর হয়ে ওঠে আখের রসের পিঠা, মিষ্টি গুড়ের পিঠা আর মিষ্টি খিচুড়ির গন্ধে। গ্রামীণ জীবনের সরলতা আর স্বাদে ভরা এই ঐতিহ্য এখানকার মানুষের গর্ব, আর বাইরের অতিথিদের কাছে এক অনন্য অভিজ্ঞতা।’

এ বিষয়ে মৌলভীবাজার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. জালাল উদ্দিন বলেন, ‘জেলায় বর্তমানে সীমিত পরিসরে আখ চাষ হচ্ছে। তবে সমতল ভূমিতে আখ চাষের যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। আগ্রহী কৃষকদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও পরামর্শ দেওয়া হবে।’

শীতের সকালের আখের রস আর গুড়ের ঘ্রাণে ভরা সেই গ্রামীণ ঐতিহ্য হয়তো অনেক জায়গা থেকেই হারিয়ে গেছে, তবে মিঠিপুর এখনো সাক্ষ্য হয়ে আছে—চাইলেই ঐতিহ্যকে আঁকড়ে ধরে টিকে থাকা যায়।

পুলক পুরকায়স্থ

মন্তব্য করুন:

Led Bottom Ad
Led Bottom Ad