টাঙ্গুয়ার হাওরের জীববৈচিত্র্য রক্ষায় নিতে হবে পদক্ষেপ
টাঙ্গুয়ার হাওর বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম মিঠাপানির জলাভূমি। দুই উপজেলার ১৮টি মৌজায় ৫১টি হাওরের সমন্বয়ে ১২,৬৬৫ হেক্টর এলাকা নিয়ে টাঙ্গুয়ার হাওর বিস্তৃত। প্রকৃতির এক অপরূপ সৌন্দর্য্যের আঁধার এই হাওরটি। যেখানে অবারিত জলরাশি, মেঘালয়ের কোলে প্রকৃতির জলের সংসার, যেখানে চাইলেই জলের সঙ্গে আপনি মিশে যেতে পারবেন, কান পাতলেই শোনা যায় নৌকার খোলে জলের মোলায়েম আছড়ে পড়ার শব্দ। পাহাড়ের আড়ালে অস্তায়মান সূর্যের মৃদু আলো ধরা দেবে চোখের সামনে। সেই আলোয় দেখা যায় পাখিদের দীর্ঘ বাড়িফেরা, অর্জুন চোখের শঙ্খচিল।
কিন্তু এখন পরিস্থিতি পাল্টে গেছে টাঙ্গুয়ায়। হাওরে এখন শোনা যায় না পাখিদের কিচির-মিচির রব। তার বিপরীতে কানে বাজে
হিন্দি গানের শব্দ, সাউন্ড-সিস্টেমসহ গান-বাজনা। জনাকীর্ণ ওয়াচ টাওয়ার। যে কারণে এখন আর হাওরে কোনো জলজ পাখি দেখবেন না। পানকৌড়ি, কানি বক নেই। নেই মৌনি মাছরাঙা। শকুন, বেগুনি কালেম, ডাহুক, বালিহাঁস, গাঙচিল, সারস, কাক, শঙ্খচিল, পাতি কুট ইত্যাদি নামের পাখিগুলো একসময় টাঙ্গুয়ার হাওরে যে দেখা যেত, তা মানুষ ভুলে গেছে। সারা বছরের অধিবাসী সাধারণ পাখিগুলোও দেখা যায় না আর। করচের বনের পোকারাও মনে হয় শঙ্কিত হয়ে পালিয়েছে।
পর্যটনের নামে কিছু হাউসবোট ব্যবসায়ীরাও পাল্লা দিয়ে আকৃষ্ট করছে পর্যটকদের। সর্বোচ্চ সুযোগ-সূবিধা উল্লেখ করে প্রতিযোগীতায় নামছেন হাওর ধ্বংশে। ফলে প্রতিদিনই টাঙ্গুয়ার হাওরে সমাগম ঘটছে হাজারো পর্যটকের। কোমল পানীয়, চিপস ও অন্যান্য প্যাকেটজাত খাদ্যপণ্য ভাসছে হাওরের পানিতে। হাউসবোটগুলোকে এ ধরনের খাদ্য ও পানীয় নিরুৎসাহিত করতে উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে। তারা জানিয়েছ, এটা করা সম্ভব। কিন্তু যেসব নৌকার বিনিয়োগ কম, তাদের নিয়ন্ত্রণ করা বেশ বড় একটি চ্যালেঞ্জ।
তবে আশার কথা- মনুষ্যসৃষ্ট জৈব বর্জ্য নিয়ন্ত্রণে জেলা প্রশাসন ভাবনাগত পরিবর্তন আনতে ইতিমধ্যে একাধিক সেমিনার আয়োজন করেছে, যাতে হাউসবোট মালিকদের একটি বড় অংশ উপস্থিত ছিল। হাউসবোটগুলো মনুষ্যসৃষ্ট জৈব বর্জ্য সরাসরি পানিতে ফেলে। ফলে তা মানুষ ও জীববৈচিত্র্যের জন্য একটি অস্বাভাবিক বাস্তুসংস্থান সৃষ্টি করে, যা কারও জন্যই স্বাস্থ্যকর নয়। কিন্তু তাতে কি কোন কাজ হয়েছে ? কেন হয় নি-এই প্রশ্নের উত্তর পেলেই পদক্ষেপটি আলোর মুখ দেখতে পারে।
হাওর ভ্রমণে পর্যটকদের জন্য করনীয় কিছু নির্দেশনাও রয়েছে। তবে তদারকি না থাকায় নির্দেশনা মানছেন না পর্যটকরা। যে কারণে দিন দিন শ্রীহীন হয়ে পড়ছে টাঙ্গুয়ায় হাওর। ধ্বংশ হচ্ছে প্রাণ-প্রকৃতি। হাওরের মতো অনন্য পরিবেশও শুধু সম্পদের উৎস নয়। এই জলজ পরিবেশের অন্তর্নিহিত সৌন্দর্য রয়েছে। যারা পর্যটক হিশেবে হাওরে আসেন তাঁরা পর্যটন ব্যয় নির্বাহ করতে পারেন। অনেকাংশে তাঁরা শিক্ষিত; কিন্তু তাঁদের পর্যটনে এই অঞ্চলের অন্তর্নিহিত সৌন্দর্য আর আধ্যাত্মিকতার প্রতি ভালোবাসা অনুপস্থিত।
জেলা প্রশাসন সুনামগঞ্জ টাঙ্গুয়ার হাওরের জন্য এই বিরূপ পর্যটনকে নিয়ন্ত্রিত ও নিরুৎসাহিত করতে অনেক দিন ধরেই কাজ করছে। যাঁরা এই পর্যটনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট, তাঁদের মোটামুটি সবাই জেলা প্রশাসনের এই উদ্যোগের সঙ্গে পরিচিত। একটি বড় অংশ এই উদ্যোগকে সমর্থন জানায়। কিন্তু লাস ভেগাসীয় পর্যটন নিরুৎসাহিত করতে যে শক্তি দরকার, তা জেলা প্রশাসন বিভিন্ন কারণে প্রয়োগ করতে পারে না।
সৌন্দর্য়্য থাকলে তার কদর থাকে। তার আগে দরকার সৌন্দর্য্যকে ধরে রাখা। এই ধরে রাখার দায়িত্ব কেবল জেলা প্রশাসনের একার নয়। সচেতন এবং সৌন্দর্য্যপিপাসু হিসেবে আপনিও একজন দায়িত্বশীল। আপনার আমার দায়িত্বশীল ভূমিকা এ ক্ষেত্রে কার্যকর পদক্ষেপ। সবার সম্মিলিত উদ্যোগ নেওয়া হলেই শুধু একটি মারাত্মক পরিণতি এড়ানো সম্ভব।
মীর্জা ইকবাল
মন্তব্য করুন: