পশ্চিমবঙ্গকে গ্রেটার বাংলাদেশ বানানোর চেষ্টা চলছে :শুভেন্দু
পশ্চিমবঙ্গের সাবেক বামফ্রন্ট ও তৃণমূল কংগ্রেস সরকারের বিরুদ্ধে তীব্র আক্রমণ শানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। তিনি অভিযোগ করেছেন, দীর্ঘদিন ধরে রাজ্যের ‘সনাতনী ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি’ দমিয়ে রাখার চেষ্টা হয়েছে। বামফ্রন্ট ধর্মকে ‘আফিম’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছিল এবং তৃণমূল কংগ্রেস পশ্চিমবঙ্গকে ‘গ্রেটার বাংলাদেশে’ পরিণত করার চেষ্টা করেছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) কলকাতার কেষ্টপুরে একটি গণেশ পূজার মণ্ডপ উদ্বোধন করে এসব কথা বলেন শুভেন্দু অধিকারী। তিনি বলেন, প্রায় পাঁচ দশক ধরে পশ্চিমবঙ্গের সাংস্কৃতিক পরিচয় দুর্বল করার চেষ্টা হয়েছে। এর মধ্যে ৩৪ বছর বামফ্রন্ট এবং পরবর্তী ১৫ বছর তৃণমূল কংগ্রেস রাজ্য শাসন করেছে।
শুভেন্দু বলেন, ‘গত ৪৯ বছর ধরে ৩৪ বছর যারা কমিউনিস্ট হিসেবে ক্ষমতায় ছিল, তারা ধর্মকে আফিম বলত। এরপর ১৫ বছর তারা বাংলাকে গ্রেটার বাংলাদেশ বানানোর চেষ্টা করেছে। এখন এমন একটি সরকার এসেছে, যারা ভুলে যেতে বসা সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে চায়।’
বামফ্রন্ট আমলের সমালোচনা করে তিনি বলেন, বিভিন্ন পূজামণ্ডপের বাইরে বইয়ের স্টলে কার্ল মার্কস ও ভ্লাদিমির লেনিনের বই পাওয়া যেত। কিন্তু সেখানে স্বামী বিবেকানন্দ বা লোকনাথ বাবার লেখা বই পাওয়া যেত না। এমনকি হনুমান চালিসা কিংবা ভগবদ্গীতাও দেখা যেত না বলে দাবি করেন তিনি।
শুভেন্দুর ভাষ্য, সে সময় প্রকাশ্যেই বলা হতো তারা ধর্মে বিশ্বাস করেন না এবং ধর্মকে ‘আফিম’ মনে করেন। তবে বর্তমান সরকার সনাতনী সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে পুনরুজ্জীবিত করতে কাজ করছে বলে দাবি করেন তিনি।
তৃণমূল কংগ্রেসের শাসনামল নিয়েও অভিযোগ তোলেন শুভেন্দু। সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাম সরাসরি না নিয়ে তিনি অভিযোগ করেন, তৃণমূলের শাসনের শেষ দিকে বাংলাকে ‘জামাতি’ করার চেষ্টা হয়েছিল।
দুর্গাপূজার বিসর্জনের সময় পরিবর্তনের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, এক বছর মহরমের সঙ্গে বিজয়া দশমীর দিন মিলে যাওয়ায় দুর্গাপ্রতিমা বিসর্জনের সময় পরিবর্তন করা হয়েছিল। তার দাবি, মহরমের কারণে বিজয়া দশমীতে বিসর্জন দেওয়া যাবে না—এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। শুভেন্দু বলেন, ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী পঞ্জিকা অনুসরণ করেই এসব আয়োজন করতে হয় এবং এভাবে বাংলার ঐতিহ্য ধীরে ধীরে পরিবর্তনের চেষ্টা করা হয়েছিল।
রাজ্যের সাবেক এক মন্ত্রীর প্রসঙ্গও টেনে আনেন শুভেন্দু, যিনি বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন। তার অভিযোগ, সাবেক মুখ্যমন্ত্রী পিতৃপক্ষের সময় ওই মন্ত্রীর দুর্গাপূজার উদ্বোধনে গিয়েছিলেন। সনাতনী রীতি অনুযায়ী পিতৃপক্ষকে এমন আয়োজনের জন্য শুভ সময় হিসেবে বিবেচনা করা হয় না বলে মন্তব্য করেন তিনি।
শুভেন্দু বলেন, দুর্গাপূজার উদ্বোধন মাতৃপক্ষেই হওয়া উচিত। একই সঙ্গে মহাষ্টমীর মতো গুরুত্বপূর্ণ দিনে ‘পরম পবিত্রতা’ বজায় রাখার ওপরও জোর দেন তিনি।
দেশভাগের প্রসঙ্গ তুলে শুভেন্দু নিজের পরিবারের ইতিহাসের কথাও বলেন। তিনি জানান, হিন্দু পরিচয়ের কারণে তার মা তৎকালীন পূর্ববঙ্গের বরিশাল থেকে পালিয়ে আসতে বাধ্য হয়েছিলেন। তখন তার মায়ের কাছে পরনের কাপড় ছাড়া প্রায় কিছুই ছিল না বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
পশ্চিমবঙ্গকে বাঙালি হিন্দুদের ‘স্বদেশ’ হিসেবে উল্লেখ করে শুভেন্দু বলেন, ১৯৪৭ সালের ২০ জুন রাজ্যটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। তিনি সনাতনীদের ভাষা ও জাতিগত পরিচয়ের বিভাজন ভুলে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানান।
গণেশ পূজা ও দুর্গাপূজার প্রসঙ্গ টেনে শুভেন্দু বলেন, আগে পশ্চিমবঙ্গে এত বেশি গণেশ পূজা হতো না। অনেকে মনে করতেন এটি শুধু মহারাষ্ট্রের উৎসব। কিন্তু তার মতে, গণেশ পূজা বিশ্বের সব সনাতনীর জন্য। একইভাবে দুর্গাপূজাকেও শুধু কলকাতার মানুষের উৎসব হিসেবে দেখার সুযোগ নেই বলে মন্তব্য করেন তিনি।
তিনি বলেন, হিন্দিভাষী, গুজরাটি, বাঙালি বা মারওয়ারি—এভাবে মানুষের মধ্যে যে বিভাজনের দেয়াল তৈরি করা হয়েছিল, ২০২৬ সালে তারা সেই দেয়াল ভেঙে দিয়েছেন। শেষ পর্যন্ত সবাই ভারতীয়—এমন মন্তব্য করে বাংলাকে বাঙালি হিন্দুদের স্বদেশ হিসেবে রক্ষা করার দায়িত্ব সবার বলে উল্লেখ করেন তিনি।
শুভেন্দু বলেন, তার সরকার ‘বহুজন সুখায়, বহুজন হিতায়’ নীতিতে বিশ্বাস করে। অর্থাৎ, বহু মানুষের সুখ ও কল্যাণের জন্য কাজ করাই সরকারের মূল লক্ষ্য।
রত্না বাউরী
মন্তব্য করুন: