শাহজালাল (রহ.) মাজারে দুর্নীতির কালো সাম্রাজ্য নিয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য ফাঁস

শাহজালাল (রহ.) মাজারে দুর্নীতির কালো সাম্রাজ্য নিয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য ফাঁস

মীর্জা খলিল, ঢাকা অফিস

১৮/০৭/২০২৬ ১৬:১০:৪১

প্রধান উপদেষ্টা পদত্যাগ করবেন না: ফাইজ তাইয়েব আহমেদ

হজরত শাহজালাল (রহ.)-এর মাজারকে জিম্মি করে দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেটের ভয়ংকর অনিয়ম, দুর্নীতি ও অর্থ আত্মসাতের চিত্র এবার প্রকাশ্যে এসেছে। মাজারের দানবাক্সের বিপুল অর্থ, মানতের পশু ও বিভিন্ন খাতের আয় সংঘবদ্ধভাবে লুটপাট করা হচ্ছে বলে গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন সিলেটের বিদায়ী জেলা প্রশাসক (ডিসি) সারোয়ার আলম।


সম্প্রতি জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে মাজারের দানবাক্স সিলগালা ও অর্থ গণনার পর এই অন্ধকার সাম্রাজ্যের চাঞ্চল্যকর তথ্য উন্মোচিত হয়েছে, যা মাজারকেন্দ্রিক সিন্ডিকেটের কার্যক্রম নিয়ে নতুন করে তোলপাড় সৃষ্টি করেছে।


জানা যায়, বিগত প্রায় ৭০০ বছর ধরে চলা এই মাজারের দানবাক্সগুলোতে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক তদারকি ছিল না। দানের অর্থ সরাসরি বস্তায় ভরে প্রভাবশালী মহলের নিয়ন্ত্রণে চলে যেত। এ নিয়ে জনমনে তীব্র অসন্তোষের জেরে গত ১৮ জুন সিলেটের জেলা প্রশাসন মাজারের ৩টি ডেক ও ৪টি দানবাক্স সিলগালা করে দেয়।


গত ২২ জুন ইতিহাসে প্রথমবারের মতো সর্বসাধারণের সামনে ও সিসিটিভি ক্যামেরার নজরদারিতে দানবাক্সগুলো খোলা হলে মাত্র ৪ দিনেই ১৭ লাখ ৬৫ হাজার ৫৪৯ টাকা জমা পড়ে। এরপর প্রথম গণনার ১৯ দিন পর, গত ১১ জুলাই পুনরায় বাক্সগুলো খোলা হলে আরও ৪৭ লাখ ১০ হাজার ১৫৩ টাকা পাওয়া যায়। অর্থাৎ, মাত্র ২৫ দিনে নগদ সংগৃহীত হয় ৬৪ লাখ ৭৫ হাজার ৭০২ টাকা। নগদ টাকার পাশাপাশি দানবাক্সে মিলেছে ১২টি দেশের বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা, স্বর্ণালংকার, চমকপ্রদ চিঠি ও রহস্যময় চিরকুট। এছাড়া মানত হিসেবে এসেছে ৬৫টি ছাগল ও গবাদিপশু।


টাকা কম দেখানোর অপকৌশল ও সাবেক ডিসির বক্তব্য

ডিসি বদলি হওয়ার পরপরই স্থানীয় মহলে গুঞ্জন ওঠে, মাজারের স্বচ্ছতা আনার এই সাহসী উদ্যোগের কারণেই জেলা প্রশাসক সারোয়ার আলমকে সিলেট ছাড়তে হয়েছে। সাবেক ডিসি সারোয়ার আলম বলেন- "আমরা যখন প্রথমবার ২২ জুন দানের টাকা গুনছিলাম, তখনো হয়তো মাত্র ৪০-৪৫ ভাগ টাকা মাজারের বক্সে পড়েছে। বাকি টাকা তারা নগদ হাতে হাতে নিয়ে নিয়েছে। আর ১১ জুলাই পাওয়া গেছে মাত্র ২০-২৫ ভাগ টাকা। বাকি সব অর্থ আত্মসাৎ হয়েছে।"


তিনি জানান, মূল টাকাটা ওঠে কবরস্থানের পাশের ঝরনা এলাকা থেকে। সেখানে সিন্ডিকেটের সদস্যরা ভক্তদের স্পষ্ট বলে থাকে -‘আপনারা যদি মাজারকে দিতে চান তবে আমাদের হাতে দিন, আর সরকারকে দিতে চাইলে এই বক্সে ফেলুন।’ এছাড়া দানবাক্সে যাতে নারীরা টাকা ফেলতে না পারেন, সেজন্য মাজারের কেরানি সামুন মাহমুদ খানের ইশারায় মহিলা ইবাদতখানাও বন্ধ রাখা হয়েছে। এমনকি টাকা হাতে হাতে নেওয়ার জন্য দরগার দেওয়ান নামধারী কেরানি জহুর উদ্দিন রশীদ সরাসরি মাঠে নেমেছেন বলে ভক্তরা অভিযোগ করেছেন।


সিন্ডিকেটের আয়ের উৎস ও 'একই পশু সাতবার বিক্রি'র মহোৎসব

অনুসন্ধানে জানা গেছে, মাজারের মোতাওয়াল্লি ও খাদেমদের আয়ের মূল উৎস মাজারের নিজস্ব সম্পত্তি (মার্কেট, দোকানপাট, পুকুর) এবং ডেক ও দানবাক্সের টাকা। এর বাইরে বড় অঙ্কের লেনদেন হয় ব্যক্তিগত ‘নজরানা’র মাধ্যমে। বিশেষ করে যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও মধ্যপ্রাচ্য প্রবাসী এবং দেশের শীর্ষস্থানীয় ভিআইপিরা যখন মাজারে আসেন, তারা খাদেমদের হাতে লাখ লাখ টাকা, বৈদেশিক মুদ্রা ও স্বর্ণ তুলে দেন, যা সম্পূর্ণ আত্মসাৎ করা হয়। এছাড়া বাৎসরিক ওরশের সময় আসা গরু-মহিষ ও নগদ অর্থ খাদেমদের বিভিন্ন উপ-গ্রুপের মধ্যে ভাগবাঁটোয়ারা হয়।


সবচেয়ে চমকপ্রদ জালিয়াতি ঘটে মানতের পশু নিয়ে। কেউ পশু মানতের উদ্দেশ্যে এসে কেরানি সামুনের গোয়ালঘরে গেলে, আগে থেকে ভক্তদের দান করা গরু বা ছাগলই নতুন মানতকারীদের কাছে বিক্রি করা হয়। এভাবে একেকটি পশু সুকৌশলে সাতবার পর্যন্ত বিক্রি করার নজির রয়েছে।


সুদের ব্যবসা, বারি-বাণিজ্য ও অপরাধের নেটওয়ার্ক

মাজারের প্রায় ৫০০ খাদেমের একটি বড় অংশ এই অপরাধ নেটওয়ার্কের সাথে যুক্ত। এর মধ্যে মূল নিয়ন্ত্রণ ৩০ জন মুরুব্বি খাদেমের হাতে, যাদের নেপথ্য আশীর্বাদদাতা কেরানি সামুন মাহমুদ খান ও খোকন ওরফে 'বকরি খোকন'। প্রতিদিন ফজর থেকে পরবর্তী ফজর পর্যন্ত নির্দিষ্ট একজন খাদেমের ‘বারি’ বা ডিউটি থাকে। এই ২৪ ঘণ্টায় মাজারের বিভিন্ন খাত থেকে গড়ে ৪ থেকে ৫ লাখ টাকা এবং ছুটির দিনগুলোতে ১০ লাখ টাকারও বেশি নগদ সংগ্রহ হয়, যার সিংহভাগ সিন্ডিকেটের মূল হোতারা ভাগ করে নেয়। কোনো সাধারণ খাদেম অর্থকষ্টে ভুগলে খোকন তার ফান্ড থেকে দানের টাকা ধার দেয় এবং পরবর্তীতে বারি পাওয়ার পর চড়া সুদে তা কেটে নেওয়া হয়।


সামুন ও খোকন সিন্ডিকেটের অন্যতম চার বিশ্বস্ত সহযোগী— মনি, কুতুব, বাবুল ও মিলন মাজার প্রাঙ্গণের পকেটমার, ছিনতাইকারী ও জুতাচোর সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করে। এই চুরির টাকার একটি বড় অংশ পার্সেন্টেজ হিসেবে সামুন ও খোকনের পকেটে যায়।


নির্যাতনের আখড়া ও বাবুর্চিদের লুটপাট

মাজারে কেউ অন্যায়ের প্রতিবাদ করলে তাকে ‘জুতাচোর’ বা ‘মোবাইল চোর’ সাজিয়ে অমানুষিক নির্যাতন করার অভিযোগ রয়েছে মাজারের হেড বাবুর্চি সোহেল ও তার সহযোগী ফয়েজের বিরুদ্ধে। পরে ভুক্তভোগীর পরিবারকে ডেকে পুলিশে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে মোটা অঙ্কের টাকা আদায় করা হয়।


মানতের গরু জবাইয়ের পর রান্নার জন্য সরকারিভাবে ২ হাজার টাকা এবং খাসির জন্য ৫০০ টাকা নেওয়ার বিধান থাকলেও, এই সিন্ডিকেট গরুর ক্ষেত্রে ১০ থেকে ১৮ হাজার এবং খাসির ক্ষেত্রে ২ থেকে ৩ হাজার টাকা হাতিয়ে নেয়। এছাড়া কসাইরা চামড়া ছাড়ানোর সময় সুকৌশলে ১০-১৫ কেজি আস্ত মাংস চামড়ার সাথে রেখে দেয়। কয়েক ধাপে মাংস গায়েব করায় একটি পশুর তিন ভাগের এক ভাগ মাংসও রান্না হয় না, উপরন্তু শিন্নি পাকের পর অর্ধেক মাংস বাবুর্চিরা নিয়ে যান। এমনকি ভক্তদের দেওয়া দামি গিলাফ ও গোলাপজল মাজার থেকে সরিয়ে পুনরায় সামনের দোকানে চড়া দামে বিক্রি করা হয়।


কর্তৃপক্ষ ও প্রশাসনের বক্তব্য

মাজারের মোতাওয়াল্লি ফতেহ উল্লাহ আল আমান সিন্ডিকেটের অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, "মাজারে যেসব সমস্যা রয়েছে সেগুলো আলোচনার মাধ্যমে সমাধান না করে ‘যুদ্ধংদেহী মনোভাব’ নিয়ে সিসি ক্যামেরা লাগানো বা ডেক সিলগালা করা অনভিপ্রেত। মাজারের নিজস্ব শৃঙ্খলারক্ষীরা সবসময় পকেটমার ও প্রতারকদের প্রতিহত করে আসছে।"


দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) সিলেট জেলা সমন্বিত কার্যালয়ের উপপরিচালক সুবেল আহমেদ জানান, "বেশ কিছুদিন ধরে দুদকে কমিশন (চেয়ারম্যান ও দুই কমিশনার) না থাকায় অনুমোদনের অভাবে আমরা আনুষ্ঠানিক তদন্ত করতে পারছি না। তবে আমরা আন-অফিশিয়াল তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করেছি। কমিশন গঠনের পর অনুমতি পেলেই অনুসন্ধান শুরু হবে।"


সিলেটের নবনিযুক্ত জেলা প্রশাসক আব্দুল্লাহ আল মামুন (যিনি ১৩ জুলাই যোগদান করেছেন) জানান, "মাজারের নানা অনিয়ম ও দুর্নীতি অনুসন্ধানের জন্য এরই মধ্যে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। ওই কমিটিকে আগামী এক মাসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। প্রতিবেদন পাওয়ার পর পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।"

নীরব চাকলাদার

মন্তব্য করুন:

Led Bottom Ad
Led Bottom Ad