হাম–সুনামির সামনে জাতির নীরবতা—এ লজ্জা কার?
বাংলাদেশে হাম ছড়িয়ে পড়ছে মহামারির মতো। হাসপাতালগুলোতে শিশুর লাশ বাড়ছে, শয্যার পাশে মায়ের আর্তনাদ বাড়ছে—কিন্তু দেশের বিবেক কোথায়? একদিকে টিকা সংগ্রহে প্রশাসনিক ব্যর্থতা, অন্যদিকে পরিবারগুলোর কাছে টিকা পৌঁছাতে অব্যবস্থা—সব মিলিয়ে আজকের এই ভয়াবহ বিপর্যয় অপরিকল্পিত স্বাস্থ্যব্যবস্থা ও দায়িত্বহীনতার নগ্ন স্বীকারোক্তি ছাড়া আর কিছু নয়। বিশ্বের যেকোনো দেশে শিশুমৃত্যুর এমন ধারা হলে সরকার, মিডিয়া, সামাজিক অঙ্গন সমস্বরে গর্জে উঠত। কিন্তু বাংলাদেশে? এ যেনো এক শীতল খামখেয়ালি নীরবতা।
সাধারণ মানুষ যখন আজ নিরুপায় কর্পোরেট ভিত্তিক সংবাদমাধ্যমগুলো তখন যেন এক অদ্ভুত চুপচাপ খেলায় মেতে ওঠেছে। হাম আতঙ্কে দেশ থরথর করলেও, ক্যামেরা ব্যস্ত থাকে রাজনীতি, গসিপ আর চিরাচরিত নাটকীয়তায়। কোথায় প্রথমপাতায় অনুসন্ধানী প্রতিবেদন? কোথায় টিকা ঘাটতির দায় কার—তার খোঁজ? কোথায় প্রশ্ন, কোথায় জবাবদিহি? মনে হয় শিশুর মৃত্যু আর্থিকভাবে “সেলেবল” নয়—তাই তাদের গল্প ম্লান হয়ে যায় কর্পোরেট নিউজরুমে।
দেশের সামাজিক নেতা, সংস্কৃতিকর্মী, শিল্পী—যারা দুর্যোগে মানুষের জন্য কণ্ঠ তোলেন—তাদের নীরবতা আরও বেদনাদায়ক। দেশের শিশুরা মরছে, কিন্তু নেই কোনো বৃহৎ ক্যাম্পেইন, নেই সচেতনতামূলক প্রচার, নেই সরকারের প্রতি চাপ সৃষ্টির আহ্বান। এই উদাসীনতা শুধু হতাশাজনক নয়—এটি জাতীয় লজ্জা।
সারা দেশের মতো সিলেটেও হাম পরিস্থিতি ভয়াবহ। এখন পর্যন্ত শুধু সিলেট জেলাতেই মারা গেছে ২৬ জন শিশু। শহীদ শামসুদ্দিন হাসপাতালের করুণ দৃশ্য—একটি বেডে ৪–৫ জন শিশুকে রাখা হচ্ছে—স্বাস্থ্যসেবার নামে এটি অবমাননাকর অবস্থা। একই চিত্র সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেও। সম্প্রতি সিলেটের এক প্রান্তিক এলাকা থেকে একটি অ্যাম্বুলেন্সে করে ১৫ জন হাম-আক্রান্ত শিশুকে হাসপাতালে আনার দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। এই একটি দৃশ্যই বলে দেয়—টিকা ব্যবস্থাপনা ভেঙে পড়েছে, প্রান্তিক জনগণ অসহায়, আর দায়িত্বপ্রাপ্তেরা শুধুই দেখছে আর নিজেদের ফায়দা লুটছে।
আমরা জানি এবং বিশ্বাস করি হাম প্রতিরোধ সম্ভব—প্রমাণ রয়েছে বিশ্বের প্রতিটি টিকা-সচেতন দেশে। কিন্তু বাংলাদেশে এই মৃত্যু মিছিল থামাতে কঠোর রাজনৈতিক সদিচ্ছা একান্ত আবশ্যক। আরো প্রয়োজন রয়েছে গণমাধ্যমের সাহসী ভূমিকা এবং সামাজিক অঙ্গনের জাগ্রত বিবেক। আমি একজন সাহিত্য শ্রমিক হিসেবে বলতে চাই আজ শিশুর জীবন রক্ষার প্রশ্নে আমরা যদি নীরব থাকি—কাল ইতিহাস আমাদের ক্ষমা করবে না।
লেখক: কানাডা প্রবাসী, ছড়াকার, সাংবাদিক ও কলামিস্ট
এ রহমান
মন্তব্য করুন: