ঘাতক বাসের ‘একটি ফোন কল’ কেড়ে নিল ৫ প্রাণ
অসুস্থ বাবার চিকিৎসার পথে শেষ হলো এক পরিবারের গল্প
সুনামগঞ্জের তাহিরপুরের বৃদ্ধ ইউসুফ আলী (৫৫) দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ। সন্তানদের ইচ্ছা ছিল উন্নত চিকিৎসার জন্য বাবাকে সিলেটে নিয়ে যাবেন। সেই স্বপ্ন নিয়ে আজ সোমবার (৪ মে) দুপুরে দুই মেয়ে ও এক আত্মীয়কে সঙ্গে নিয়ে বাড়ি থেকে বের হয়েছিলেন তিনি। কিন্তু নিয়তির নিষ্ঠুর পরিহাস, যে বাবার সুস্থতার জন্য পথ চলা, সেই বাবাকে সঙ্গে নিয়েই না-ফেরার দেশে চলে গেলেন সবাই। ঘাতক বাসের চালকের একটি দায়িত্বজ্ঞানহীন ফোন কল আর বেপরোয়া গতিতে মুহূর্তেই মুছে গেল একটি পরিবারের সব হাসি।
সোমবার দুপুরে সুনামগঞ্জ-সিলেট সড়কের ছাতক উপজেলার জালালপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনে ঘটে এই মর্মান্তিক ঘটনা। সিলেট থেকে আসা ‘রিফাত পরিবহন’ (ঢাকা মেট্রো-ব ১১-৭৭৬৯) নামক দ্রুতগামী বাসটির চালক ফোনে কথা বলতে বলতে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। প্রত্যক্ষদর্শী ও বাসযাত্রীদের ভাষ্যমতে, চালক কথা বলায় এতটাই মগ্ন ছিলেন যে, তিনি বাসটিকে সড়কের নির্ধারিত লেন থেকে সম্পূর্ণ উল্টো দিকে নিয়ে যান। ঠিক সেই মুহূর্তেই বিপরীত দিক থেকে আসা ইউসুফ আলীদের বহনকারী সিএনজিচালিত অটোরিকশাটিকে সজোরে ধাক্কা দেয় বাসটি।
বিকট শব্দে অটোরিকশাটি দুমড়েমুচড়ে ছিটকে পড়ে রাস্তার অনেক দূরে। ঘটনাস্থলেই নিথর হয়ে যান ইউসুফ আলী এবং অটোরিকশার চালক। গুরুতর আহত অবস্থায় ইউসুফ আলীর দুই মেয়ে নিলুফা আক্তার (৩৫) ও কেয়া আক্তার (১৫) এবং ভাতিজি জামাই শাহাব উদ্দিনকে (৪৫) উদ্ধার করে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। কিন্তু হাসপাতালের শুভ্র বিছানায় ফেরার বদলে একে একে তারাও মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন।
বালীজুরি ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য আলী নেওয়াজ অশ্রুসজল চোখে জানান, ইউসুফ আলীর শারীরিক অবস্থা ভালো ছিল না বলে ছেলে-মেয়েরা তাঁকে চিকিৎসার জন্য সিলেটে নিয়ে যাচ্ছিল। কে জানত, সেই পথই হবে তাদের শেষ যাত্রা। ঘটনার সাক্ষী জালালপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক সাইদুল ইসলাম ডালিম বলেন, “হঠাৎ বিকট শব্দ শুনে তাকিয়ে দেখি বাসটি সড়কের ভুল দিকে গিয়ে অটোরিকশাটিকে পিষে দিয়েছে। চালকের খামখেয়ালিপনায় চোখের পলকে শেষ হয়ে গেল কয়েকটি প্রাণ।”
জয়কলস হাইওয়ে পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুল মোতালেব জানিয়েছেন, মরদেহগুলো উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। দুর্ঘটনাকবলিত বাসটি খাদে উল্টে পড়লে স্থানীয়রা জানালার কাঁচ ভেঙে বাসের যাত্রীদের উদ্ধার করেন। ঘাতক চালকের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। তবে আইনি বিচার হলেও যে অসুস্থ বাবার জন্য সন্তানেরা পথে নেমেছিলেন, সেই পরিবারের দীর্ঘশ্বাস আর কোনোদিন থামবে না। মহাসড়কের পিচঢালা কালো পথে আজ শুধু রয়ে গেছে এক অসুস্থ বাবার চিকিৎসার নথিপত্র আর হারানো স্বজনদের রক্ত।
এ রহমান
মন্তব্য করুন: