১০০০ কোটি টাকার ফসলহানির আশঙ্কা
‘কাচইরা’ বছরে জলাবদ্ধতার কবলে সুনামগঞ্জ
সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলে এবার দেখা দিয়েছে ‘কাচইরা’ বা অতিবৃষ্টির সর্বনাশা বছর। কয়েক দশকের ব্যবধানে ফিরে আসা এই প্রাকৃতিক দুর্যোগে জেলার ছোট-বড় ১৩৭টি হাওরের বোরো ফসল এখন পানির নিচে। গত ২৬ এপ্রিল থেকে শুরু হওয়া টানা ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট জলাবদ্ধতায় বিপর্যয়ের মুখে পড়েছেন লাখ লাখ কৃষক। হাওর আন্দোলনের নেতৃবৃন্দের দাবি, অপরিকল্পিত বাঁধের কারণে পানি নিষ্কাশনের পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এবার ক্ষয়-ক্ষতির পরিমাণ ১০০০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে।
হাওর বিশেষজ্ঞ ও প্রবীণ কৃষক নেতা অধ্যাপক চিত্তরঞ্জন তালুকদারের মতে, পানি উন্নয়ন বোর্ডের অপরিকল্পিত অস্থায়ী পরিকল্পনা হাওরগুলোকে এক একটি ‘পুকুরে’ পরিণত করেছে। প্রতি বছর লাখ লাখ টন মাটি দিয়ে বাঁধ নির্মাণের ফলে হাওরের ভেতরের প্রাকৃতিক জলাশয় ও নদী-নালা ভরাট হয়ে গেছে, যা দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতার মূল কারণ। অন্যদিকে গবেষক সজল কান্তি সরকার মনে করেন, অধিক উৎপাদনের আশায় দেশি ধানের পরিবর্তে হাইব্রিড ও উফশী ধান চাষ করায় ফসল কাটার মৌসুম বিলম্বিত হচ্ছে, যা আগাম বন্যার ঝুঁকির মুখে পড়ছে। চৈত্র মাসে পেকে যাওয়া দেশি প্রজাতির ধান হলে এই ক্ষতি এড়ানো সম্ভব ছিল।
সরকারি পরিসংখ্যানও এই দুর্যোগের ভয়াবহতা নিশ্চিত করছে। গত বছর ২৯ এপ্রিল পর্যন্ত জেলার ৮৩ শতাংশ ধান কাটা শেষ হলেও এ বছর সেই হার মাত্র ৪৪.৫০ শতাংশ। গত বছরের তুলনায় এ বছর সুরমা নদীর পানির উচ্চতা ও বৃষ্টিপাতের পরিমাণ অনেক বেশি রেকর্ড করা হয়েছে। সুনামগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মতে, এ পর্যন্ত প্রায় ৯ হাজার ৫৪৮ হেক্টর জমির ধান নষ্ট হয়েছে। তবে হাওর বাঁচাও আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক বিজন সেনরায় জানান, বাস্তবে অন্তত ৬০ হাজার হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার আর্থিক মূল্য প্রায় ১০০০ কোটি টাকা।
হাওরপাড়ের গ্রামগুলোতে এখন কান্নার রোল। পাগনার হাওরের কিষাণী আনোয়ারা বেগম আক্ষেপ করে বলেন, “পাঁচ লাখ টাকার ধান পানির তলে, সরকার আমরারে না দেখলে উপায় নাই।” ৪৫০ মণ ধান পাওয়ার স্বপ্ন দেখা কৃষক রথিন্দ্র বর্মণ এখন ঋণের বোঝায় দিশেহারা। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. ওমর ফারুক জানিয়েছেন, দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় ধান কাটা ব্যাহত হচ্ছে এবং চূড়ান্ত প্রতিবেদনে ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত চিত্র ফুটে উঠবে। পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, বৃষ্টি কমলে জলাবদ্ধতা কমার সম্ভাবনা থাকলেও কৃষকদের গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে অপরিকল্পিত বাঁধের কুফল।
এ রহমান
মন্তব্য করুন: