ফসল হারানোর শঙ্কায় হাওরজুড়ে বিষাদ
পহেলা বৈশাখের আনন্দ নেই সুনামগঞ্জের কৃষক পরিবারে
নববর্ষ মানেই নতুন স্বপ্ন আর নতুন আশা হলেও সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চল ধর্মপাশা ও মধ্যনগরের কৃষক পরিবারে এবার চিত্রটি ভিন্ন। আগাম জলাবদ্ধতা ও শিলাবৃষ্টিতে ফসল হারিয়ে দিশেহারা হাজারো কৃষক। যাদের ফসল এখনও টিকে আছে, তারাও বৈশাখী আনন্দ ভুলে মাঠের ফসল রক্ষায় জানপ্রাণ লড়ছেন। হাওরবাসীর কাছে নববর্ষের উৎসবের চেয়ে এখন বড় দুশ্চিন্তা—এক মুঠো অন্ন ঘরে তোলা।
কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, ধর্মপাশা ও মধ্যনগর উপজেলায় এ বছর প্রায় ৩১ হাজার ৯১০ হেক্টর জমিতে বোরো চাষাবাদ হয়েছে। তবে ইতোমধ্যে দুই উপজেলার অন্তত ৬৫৫ হেক্টর জমির ফসল পানিতে তলিয়ে গেছে। সবচেয়ে বড় ধাক্কা খেয়েছে টগার হাওরের কৃষকরা। মধ্যনগরের রংচী গ্রামের কৃষক আরশাদ মিয়া জানান, টাঙ্গুয়ার হাওরে তাঁর ৮ কেয়ার জমির ধান পুরোটাই এখন পানির নিচে। ঋণের বোঝা আর পেটের দায়ে দিশেহারা এই কৃষকের কাছে নববর্ষ কেবল ক্যালেন্ডারের একটি পাতামাত্র। একই সুর ধর্মপাশার শালকুমড়া হাওরের কৃষক জাকিবুর হাসানের কণ্ঠেও। ফসলের টাকা না থাকায় এবার পহেলা বৈশাখে সন্তানের মুখে হাসি ফোটাতে কোনো নতুন জামা কিনতে পারেননি তিনি।
উৎসবের আমেজ না থাকায় নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে স্থানীয় বাজারগুলোতেও। ধর্মপাশা ও মধ্যনগরের কাপড়ের দোকান, জুতা ও প্রসাধনীর শো-রুমগুলোতে ক্রেতার খরা দেখা দিয়েছে। গাছতলা বাজারের কাপড় ব্যবসায়ী জালাল উদ্দিন ও বংশীকুন্ডা বাজারের রূপক সরকার জানান, অন্য বছর বৈশাখের আগে বেচাকেনার ধুম পড়লেও এবার দোকান প্রায় শূন্য। কৃষকের হাতে টাকা না থাকায় এবং নিত্যপণ্যের দাম বেশি হওয়ায় সাধারণ মানুষ কেনাকাটা থেকে বিরত থাকছেন।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও পরিবেশবাদীরা মনে করছেন, হাওরের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি কৃষি হওয়ায় ফসলহানির প্রভাব সামগ্রিক জনজীবনে পড়েছে। সুখাইড় রাজাপুর দক্ষিণ ইউপি চেয়ারম্যান মোকাররম হোসেন বলেন, জলাবদ্ধতা ও অতিবৃষ্টির কারণে কৃষকের মাঝে অবশিষ্ট ফসল হারানোর আতঙ্ক বিরাজ করছে। পরিবেশ ও হাওর উন্নয়ন সংস্থার সভাপতি কাসমির রেজার মতে, শিলাবৃষ্টি, জলাবদ্ধতা ও ব্লাস্ট রোগের কারণে জেলায় ইতোমধ্যে অন্তত ত্রিশ হাজার হেক্টর জমির ধান নষ্ট হয়েছে। এই বিশাল ক্ষতির ভার বয়ে বেড়ানো হাওরবাসীর কাছে তাই পহেলা বৈশাখ এবার উৎসবের বদলে হয়ে দাঁড়িয়েছে অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রামের দিন। সব হারানো কৃষকের মনে এখন একটাই প্রার্থনা—অবশিষ্ট ফসলটুকু যেন নির্বিঘ্নে ঘরে তোলা যায়।
এ রহমান
মন্তব্য করুন: