ব্যাপক প্রতিক্রিয়া
নামের রাজনীতিতে সিলেটের সাংস্কৃতিক প্রাণকেন্দ্র
সিলেট এর প্রধান সাংস্কৃতিক কেন্দ্রটি আবারও নাম পরিবর্তনের আলোচনায়। একসময় ‘সিলেট অডিটোরিয়াম’, পরে এম সাইফুর রহমান–এর নামে নামকরণ, তারপর আওয়ামী লীগ সরকারের সময় জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম–এর নামে ‘কবি নজরুল অডিটোরিয়াম’—এই ধারাবাহিকতার পর ২০২৬ সালে ফের নাম পরিবর্তনের উদ্যোগ ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হয়েছে তুমুল বিতর্ক।
সাংস্কৃতিক কর্মী, লেখক ও সাধারণ নাগরিকদের ফেসবুক স্ট্যাটাসে উঠে এসেছে ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি—কেউ দেখছেন এটি রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার প্রতীকী লড়াই, কেউ বলছেন আঞ্চলিক উন্নয়নে অবদান রাখা ব্যক্তিকে সম্মান জানানো অন্যায় নয়।
সামাজিক মাধ্যমে ভিন্ন সুর
এ বিষয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন সিলেটের বিশিষ্ট ছড়াকার ও সংস্কৃতিকর্মী বশির আহমদ জুয়েল। নিজ ফেসবুক পোস্টে তিনি লিখেন ‘জুয়েলের সাফ কথা, কারো খুশি কারো ব্যথা’
বশির আহমদ জুয়েল তাঁর পোস্টে বিষয়টিকে আবেগ নয়, যুক্তির জায়গা থেকে দেখার আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর মতে, জাতীয় কবির নামে দেশে অসংখ্য প্রতিষ্ঠান রয়েছে—তাঁর মর্যাদা কোনো একটি আঞ্চলিক অডিটোরিয়ামের ওপর নির্ভরশীল নয়।
একইসঙ্গে তিনি উল্লেখ করেন, এম সাইফুর রহমান দেশের অর্থনৈতিক কাঠামো আধুনিকীকরণ ও সিলেট অঞ্চলের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। তাই তাঁর নামে একটি প্রতিষ্ঠান থাকা দলীয় নয়, অবদানের স্বীকৃতি হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে।
জুয়েলের ভাষায়—সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর নাম রাজনৈতিক প্রতিহিংসার জায়গা না হয়ে ঐতিহাসিক মূল্যায়নের ভিত্তিতে নির্ধারিত হওয়াই পরিণত গণতন্ত্রের লক্ষণ।
গনতান্ত্রিক ছাত্র কাউন্সিলের সিলেট জেলা সভাপতি ও সংস্কৃতি কর্মী তানজিনা বেগম লিখেছেন,“এক অভাগা অডিটোরিয়ামের আত্মকাহিনী”
তানজিনা বেগম ব্যঙ্গাত্মক ও রূপকধর্মী ভাষায় লিখেছেন, অডিটোরিয়ামটির জীবন যেন সরকারি নেমপ্লেটের মতো—ক্ষমতার পালাবদল হলেই বদলে যায় নাম।
তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, জনগণের অর্থে নির্মিত একটি ভবনের পরিচয় কেন বারবার রাজনৈতিক প্রতীকে রূপান্তরিত হবে? তাঁর মতে, নাম পরিবর্তনের এই ‘মিউজিক্যাল চেয়ার’ সংস্কৃতির জন্য ইতিবাচক বার্তা দেয় না।
তানজিনার লেখায় মূল সুর—সম্মান দেখানোর আরও বহু পথ আছে; কিন্তু বারবার নাম বদলানো সংস্কৃতির পরিপক্বতার পরিচায়ক নয়।
নাট্যকর্মী মাসুম খান লিখেছেন, “নাম নিয়ে টানাহেঁচড়া কেন?”
মাসুম খান তাঁর পোস্টে তীব্র হতাশা প্রকাশ করেছেন। তাঁর বক্তব্য—জাতীয় কবি বা এম সাইফুর রহমান কেউই জীবদ্দশায় ভবনের নাম নিয়ে দাবি করেননি। তাহলে জনগণের অর্থে নির্মিত একটি সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের নাম নিয়ে এত টানাপোড়েন কেন?
তিনি মনে করেন, এ ধরনের রাজনৈতিক টানাহেঁচড়া সিলেটের ভাবমূর্তিকে ক্ষুণ্ন করে এবং প্রকৃত সাংস্কৃতিক চর্চাকে আড়ালে ঠেলে দেয়।
পরিশেষে বলা যায় ভিন্ন সুর—সমর্থন, সমালোচনা ও হতাশা—মিলিয়ে স্পষ্ট হয়, বিষয়টি কেবল একটি নামের নয়; এটি রাজনৈতিক সংস্কৃতি, স্মৃতির রাজনীতি এবং সামাজিক বিভাজনের প্রশ্নও বটে।
সিলেটবাসীর প্রত্যাশা একটাই—যে নামই থাকুক, এই অডিটোরিয়াম যেন থাকে সংস্কৃতির মুক্ত মঞ্চ হিসেবে, রাজনৈতিক প্রতীকী লড়াইয়ের ক্ষেত্র হিসেবে নয়।
ডি আর ডি
মন্তব্য করুন: