ভাঙছে বসতভিটা,বাজার,মসজিদ ও মাদরাসা
ধলাই নদীতে ফের বালু তাণ্ডব,অভিযোগ অস্বীকার ভাই ভাই এন্টারপ্রাইজ’র
পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে নতুন কৌশলে কোম্পানীগঞ্জে ফের তাণ্ডব চলছে বালুমহালে। তাদের তাণ্ডবে ভাঙছে ধলাই নদীর দু’পাড়। বাজার, মসজিদ, স্কুল ও বসতিগুলো এখন বিলীন হবার পথে। এই চক্রের তাণ্ডব প্রতিরোধে গ্রামবাসীরা একজোট। তবে ক্ষমতার দাপট এবং পেশি শক্তির কারণে আলফু বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে মুখ খোলার সাহস নেই তাদের। গ্রামবাসীর দাবি-ইজারাদার এবার কৌশল পরিবর্তন করে কাগজের বৈধতা দেখিয়ে ইজারা সীমার বাহির থেকেও দিনে রাতে বালু উত্তোলন করছে। এই অবস্থা চলতে থাকলে ধলাই নদীর তীরবর্তী বাজার, স্কুল, মসজিদ ও মাদরাসাগুলো নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাবে এবং ইতোমধ্যে ভাঙ্গন বিপর্যয়ে বসতিগুলো হুমকীর মুখে রয়েছে। ধলাই নদী এবং বাজার ও বসতি রক্ষায় ত্বড়িৎ হস্তক্ষেপ কামনা করে সিলেটের জেলা প্রশাসক বরাবরে ২ সেপ্টেম্বর একটি লিখিত আবেদন করেছেন কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার মোস্তফানগর গ্রামের মৃত জরু মিয়ার ছেলে মো.শাহ আলম।
সিলেটের কোম্পানীগঞ্জে ফের হানা দিয়েছে আলফু বাহিনী।
যা আছে লিখিত অভিযোগে
সিলেটের জেলা প্রশাসক বরাবরে শাহ আলমের লিখিত অভিযোগে বলা হয়,সিলেট জেলার সীমান্তবর্তী উপজেলা সমূহের প্রাকৃতিক সম্পদ ও পর্যটন সম্ভাবনা এলাকা হতে অবৈধভাবে বালু ও পাথর উত্তোলন, সংরক্ষণ, পরিবহন, লুণ্ঠন ও পাচার বন্ধে বিগত ২৬.০৮.২০২৫ ইং তারিখে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে আপনার স্বাক্ষরে একটি অফিস আদেশ জারি হয়েছে। এই অফিস আদেশ সীমান্তবর্তী উপজেলাসমূহ থেকে বালু ও পাথর পাচার বন্ধের সহায়ক হিসেবে কাজ করবে বলে আমার প্রত্যাশা। আপনার এই 'অফিস আদেশ' এর ফলে অসাধু ব্যবসায়ী যারা কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার সাদা পাথর পর্যটন এলাকা, শাহ আরেফিন টিলা, উৎমা পাথর কোয়ারি এবং বিভিন্ন জনবসতী এলাকা থেকে লক্ষ লক্ষ ঘনফুট বালু অফ সিজনে বেশি দামে বিক্রির আশায় সংরক্ষণ করে রেখেছিলেন তারা চরম বেকায় পরেছেন। তাদের এই বেকায়দা অবস্থা থেকে উদ্ধারে নেমেছেন 'ধলাই নদী দক্ষিণ বালুমহাল' ইজারাদার মেসার্স ভাই ভাই এন্টারপ্রাইজ এর সত্ত্বাধিকারী আব্দুল্লাহ আল মামুন ও তার সঙ্গীয় লোকজন।
আপনার এই 'অফিস আদেশ' কে পুঁজি করে কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার আনাচে-কানাচে সংরক্ষিত লক্ষ লক্ষ ঘনফুট অবৈধ বালু বৈধভাবে সরিয়ে নেয়ার সুযোগ করে দিচ্ছেন 'ধলাই নদী দক্ষিণ বালুমহাল' এর ইজারাদার আব্দুল্লাহ আল মামুন। তার ইজারা গ্রহণকৃত 'ধলাই নদী দক্ষিণ বালুমহাল' এর সীমানা হচ্ছে কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার কালাসাদক ও তৈমুরনগর মৌজার মোট ১৯৯.৩০ একর নদী এলাকা। উক্ত বালু মহাল থেকে একমাত্র নৌকা ছাড়া বালু পরিবহণের আর কোন সুযোগ নেই। বিধি মোতাবেক বালু মহালের সীমানার ভিতরে থেকে ইজারাদার রয়েলটি/টোল আদায় করার কথা। কিন্তু তিনি তা না করে বালু মহালের সীমানা থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে সিলেট-ভোলাগঞ্জ সড়কের কোম্পানীগঞ্জ পল্লী বিদ্যুতের সাব স্টেশন এবং কোম্পানীগঞ্জ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স স্টেশনের বিপরীতে বিগত ২৮ আগস্ট'২০২৫ ইং থেকে টোলঘর বসিয়ে প্রতি ঘনফুট বালু ৬ টাকা হারে রয়েলটি নিয়ে চালান/রশিদ দিয়ে কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার আনাচে-কানাচে সংরক্ষিত সকল অবৈধ বালু বৈধভাবে পাচারের সুযোগ করে দিচ্ছেন। ইজারাদারের এই অপকর্মে সহযোগী হিসেবে রয়েছেন তার আপন ভায়রা ভাই ৩নং তেলিখাল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহ-সভাপতি কাজী আব্দুল ওদুদ আলফু, তেলিখাল ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সদস্য আকদ্দস আলী ও তার আপন সাত ভাই মশাইদ আলী, রুস্তুম আলী, আলী হোসেন, জমির হোসেন, আলী বকস, আলী আব্বাস ও আলী আমজদ এবং উপজেলার দক্ষিণ বুড়দেও গ্রামের মৃত ইউনুস আলীর পুত্র আমির আলী ও মারফত আলী গং। কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার বালু উত্তোলন, সংরক্ষণ, পরিবহন, লুণ্ঠন ও পাচার বন্ধে জরুরি ভিত্তিতে তাদের এই অপকর্ম বন্ধ করা একান্ত অপরিহার্য।
ঘটনার শুরু যেভাবে
সিলেট জেলার কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার সাদা পাথর খ্যাত পর্যটন এলাকা থেকে পাথর লুটপাটের বিষয়টি সম্প্রতি দেশব্যাপী ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। স্বৈরাচারী আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় ২০২৪ এর ৫ আগস্ট থেকে সাদা পাথর পর্যটন এলাকার পাথর লুটপাট শুরু হয়। দিনে দুপুরে উম্মুক্ত স্থান থেকে প্রশাসনের নাকের ডগায় লক্ষ লক্ষ ঘনফুট পাথর লুটপাট কান্ডে দেশের মানুষ বিস্মিত। আলোচিত এই পাথর ও বালু লুটপাটের বিষয়টি দেশের প্রায় সকল ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়ায় ফলাও ভাবে প্রচার হলেও এর আড়ালে ঢাকা পরে যায় বালু লুটপাটের বিষয়টি।
স্থানীয়দের অভিযোগ
স্থানীয়রা জানিয়েছেন, পাথর লুটপাটের ঘটনায় সারাদেশ তোলপাড় হলে কিছুদিনের জন্য বালু ও পাথর মহালে নীরবতা বিরাজ করে। অপরাধীরা গা ঢাকা দিয়ে কিছুদিন নিস্ক্রীয় ছিল। আলোচিত পাথর লুটপাটের ঘটনায় সরব হয়ে উঠে প্রশাসন। ঘটনার জের ধরে সাবেক জেলা প্রশাসক শের মাহবুব মুরাদ ও বিতর্কিত কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বদলী হন। সর্বশেষ থানা ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বদলীর ঘটনায় পাথর রাজ্যে স্বস্থি বিরাজ করতে থাকে। বিশেষ করে নতুন জেলা প্রশাসক যোগদান পরবর্তী দৃশ্য পাল্টে যায়। অবৈধ পাথর উত্তোলসহ বালু উত্তোলন বন্ধ হয়ে যায় একেবারে। এতে করে বালু পাথর রাজ্যে এক ধরণের স্বস্থির পরিবেশ বিরাজ করতে থাকে। কিন্তু বর্তমানে ভিন্ন কৌশলে শুরু হয়েছে ধলাই নদীতে বালু খেকোদের তাণ্ডব। এই সর্বনাশা তাণ্ডবের শিকার ধলাই নদী তীরবর্তী দুই পাড়ের বাসিন্দারা।
যেভাবে কৌশল পরিবর্তন
জানা গেছে,কোম্পানীগঞ্জ উপজেলাধীন 'ধলাই নদী দক্ষিণ বালু মহাল' জেলা প্রশাসন থেকে এক বছরের জন্য ১৪৩২ বাংলা সনের জন্য ইজারা দেন মেসার্স ভাই ভাই এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী উপজেলার চাটিবহর নিবাসী আব্দুল্লাহ আল মামুন। আব্দুল্লাহ আল মামুনের নামে ইজারা নেয়া হলেও এর পেছনে রয়েছেন তারই আপন ভায়রা ভাই ৩নং তেলিখাল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহ-সভাপতি বিভিন্ন হত্যা মামলা, অস্ত্র মামলা ও বৈষম্য বিরোধী ৬টি বিস্ফোরণ মামলার এজাহারভুক্ত আসামি, কুখ্যাত সন্ত্রাসী এলাকার ত্রাস হিসেবে পরিচিত কাজী আব্দুল ওদুদ আলফু। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর আলফু চেয়ারম্যান একটু বেকায়দায় থাকায় তার হারানো প্রভাব ফিরে পেতে সিলেট জেলা যুবদলের সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ মকসুদ আহমদকে তিনি বালু মহালের অলিখিত অংশীদার করে নেন। মকসুদ কে পার্টনার হিসেবে পেয়ে আলফু চেয়ারম্যান আবারো বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন। প্রশাসনকে ম্যানেজ করে বালু মহালের সীমানার বাহিরের সাদা পাথর পর্যটন এলাকা ও রেলওয়ের সংরক্ষিত 'বাংকার' এলাকা থেকে অবাধে বালু লুটপাট শুরু করেন। বালু লুটপাটের সাথে সাথে চলে সাদা পাথর লুটপাট। মূলতঃ অবৈধভাবে বালু লুটপাটের সুযোগ কাজে লাগিয়ে বালু বহনকারী শত শত নৌকার সাথে মিলে মিশে পাথর লুটপাট কাণ্ড চলতে থাকে।
এদিকে নতুন জেলা প্রশাসক যোগদান পরবর্তী ২৬ আগষ্ট জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রাকৃতিক সম্পদ ও পর্যটন সম্ভাবনা এলাকা হতে অবৈধভাবে বালু ও পাথর উত্তোলন, সংরক্ষণ, পরিবহন, লুষ্ঠন ও পাচার বন্ধে অফিস আদেশ জারি করা হয়। এই অফিস আদেশের ফলে অসাধু ব্যবসায়ী যারা কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার সাদা পাথর পর্যটন এলাকা, শাহ আরেফিন টিলা, উৎমা পাথর কোয়ারি এবং বিভিন্ন জনবসতী এলাকা থেকে লক্ষ লক্ষ ঘনফুট বালু অফ সিজনে বেশি দামে বিক্রির আশায় সংরক্ষণ করে রেখেছিলেন তারা চরম বেকায় পরে যান। তাদের এই বেকায়দা অবস্থা থেকে উদ্ধারে নেমেছেন 'ধলাই নদী দক্ষিণ বালুমহাল' ইজারাদার মেসার্স ভাই ভাই এন্টারপ্রাইজ এর সত্ত্বাধিকারী আব্দুল্লাহ আল মামুন ও তার সঙ্গীয় লোকজন। ফলে উপজেলার আনাচে-কানাচে সংরক্ষিত লক্ষ লক্ষ ঘনফুট অবৈধ বালু বৈধভাবে সরিয়ে নেয়ার সুযোগ করে দিচ্ছেন 'ধলাই নদী দক্ষিণ বালুমহাল' এর ইজারাদার আব্দুল্লাহ আল মামুন। তার ইজারা গ্রহণকৃত 'ধলাই নদী দক্ষিণ বালুমহাল' এর সীমানা হচ্ছে কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার কালাসাদক মৌজার ৫৭ নং জে, এল, নং ৫৭ এর ৪৯৩, ১২১৩ ও ২০০২ দাগের ১২১.২৮ একর এবং তৈয়মুরনগর মৌজার তৈমুরনগর মৌজার জে, এল, নং ৬২ এর ৩৫৯ নং দাগের ৭৮.০২ একর অর্থাৎ সমুদয় ১৯৯.৩০ একর নদী শ্রেণী। ইজারাকৃত উক্ত বালু মহাল থেকে একমাত্র নৌকা ছাড়া বালু পরিবহণের আর কোন সুযোগ নেই। বিধি মোতাবেক বালু মহালের সীমানার ভিতরে থেকে ইজারাদার রয়েলটি বা টোল আদায় করার কথা। কিন্তু ইজারাদার তা না করে বালু মহালের সীমানা থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে সিলেট-ভোলাগঞ্জ মহাসড়কের পাশে কোম্পানীগঞ্জ পল্লী বিদ্যুতের সাব স্টেশন এবং কোম্পানীগঞ্জ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স স্টেশনের বিপরীতে বিগত ২৮আগস্ট'২০২৫ ইং থেকে টোলঘর বসিয়ে প্রতি ঘনফুট বালু ৬ টাকা হারে রয়েলটি নিয়ে চালান/রশিদ দিয়ে কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার আনাচে-কানাচে সংরক্ষিত সকল অবৈধ বালু বৈধভাবে পাচারের সুযোগ করে দিচ্ছেন।
পাল্টা অভিযোগ আলফু চেয়ারম্যানের
ইজারা বহির্ভুত স্থান থেকে বালু উত্তোলন এবং জেলা প্রশাসক বরাবরে লিখিত অভিযোগ বিষয়ে জানতে চাইলে উপজেলার ৩ নং তেলিখাল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান কাজী আব্দুল ওদুদ আলফু বলেন. অভিযোগকারী মূলত ‘ধলাই নদী দক্ষিণ বালুমহাল' ইজারায় অংশ নিয়েছিলেন। কিন্তু ইজারা না পেয়ে তিনি ও তাঁর লোকজন বিভিন্নভাবে ভাই ভাই এন্টার প্রাইজের নামে নানা প্রোপাগান্ডা চালিয়ে যাচ্ছে। তিনি বলেন, প্রকৃত সত্য হলো- জেলা প্রশাসন কর্তৃক ইজারা স্থান পর্যন্ত লাগ দাগ/নিশানা সাটানো রয়েছে। এর বাহিরে ইজারাদারদের যাওয়ার কোন সুযোগ নেই। ধলাই নদী দিয়ে পাথরবাহী কোন নৌযান যাবার কোন সুযোগ নেই এবং তিনি বিষয়টি চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করেন।
এ ব্যাপারে সিলেটের জেলা প্রশাসক সারোয়ার আলমের মন্তব্য জানতে চাইলে তিনি কল রিসিভ না করায় মন্তব্য আদায় করা সম্ভব হয় নি।
অভিযোগের বিষয়ে কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রবিন মিয়া বলেন, অভিযোগ সত্য নয়। কারণ ইজারা স্থানের বাহিরে বালু উত্তোলনের কোন সুযোগ নেই। যদি কেউ সেটি করে থাকেন, তাদের বিরুদ্ধে অবশ্যই অভিযান পরিচালিত থাকবে।
তাহির আহমদ
মন্তব্য করুন: