অসিত বরণের কালো থাবা
হবিগঞ্জে ‘বর্ষায় নজরুল’ আয়োজনে চরম হযবরল!
ঘোষণা ছিল মহতী আয়োজনের—জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সাহিত্য-সংগীত ও বর্ষার সৌন্দর্য নিয়ে অনুষ্ঠিত হবে ঋতুভিত্তিক সাংস্কৃতিক পরিবেশনা ‘বর্ষায় নজরুল’। কিন্তু বাস্তবে তা রূপ নিল আয়োজকদের চরম অব্যবস্থাপনা আর আমলাতান্ত্রিক দায়িত্বজ্ঞানহীনতার এক একতরফা নাটকে! সূচিতে নাম থাকা জেলার একঝাঁক শীর্ষ সাংস্কৃতিক সংগঠন একযোগে অনুষ্ঠান বয়কট করায় শেষ পর্যন্ত শুধু শিল্পকলা একাডেমির কচি-কাঁচা শিক্ষার্থীদের দিয়ে কোনোমতে জোড়াতালি দিয়ে ‘দায়সারা’ অনুষ্ঠান শেষ করেছেন আয়োজকরা।
গতকাল সোমবার সন্ধ্যায় জেলা শিল্পকলা একাডেমি মিলনায়তনে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের পৃষ্ঠপোষকতায়, শিল্পকলা একাডেমি ও জেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। তবে অনুষ্ঠান শুরু হতেই থলের বিড়াল বেরিয়ে পড়ে।
সরেজমিনে দেখা যায়, সুবিশাল মিলনায়তনে দর্শকদের কোনো তাগিদ নেই, অধিকাংশ আসনই ফাঁকা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ক্ষুব্ধ অভিভাবকরা তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন,
“জাতীয় কবির অনুষ্ঠানে মিলনায়তনের আসন খালি থাকা জাতি হিসেবে লজ্জার। সরকারি বাজেটের টাকায় দায়সারা কাজ শেষ করাই যেন শিল্পকলার মূল উদ্দেশ্য! প্রচার-প্রচারণার কোনো বালাই ছিল না।”
অনুষ্ঠানে কালচারাল অফিসার অসিত বরণ দাশ গুপ্তের সভাপতিত্বে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মোঃ আবুল হাসেম যথারীতি ‘নজরুলচর্চা ও সংস্কৃতি বিকাশের’ চর্বিতচর্বণ বুলি আওড়ান। অনুষ্ঠান সঞ্চালনায় ছিলেন আবৃত্তি প্রশিক্ষক ফরিদা আক্তার চৌধুরী কুমকুম।
সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর সঙ্গে কথা বলে বেরিয়ে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য। বিতর্কিত কালচারাল অফিসার অসিত বরণ দাশ গুপ্ত পুনরায় হবিগঞ্জে যোগদানের পর থেকেই মনগড়াভাবে একাডেমি চালাচ্ছেন বলে অভিযোগ। স্থানীয় সংগঠনগুলোর সাথে ন্যুনতম সমন্বয় না করে এবং শিল্পীদের নামে ‘নামমাত্র’ সম্মানী বরাদ্দ দিয়ে নিজের খেয়ালখুশি মতো অনুষ্ঠান সাজান তিনি।
অনুষ্ঠানসূচিতে সূরবিতান, জাসাস, হবিগঞ্জ সাংস্কৃতিক পরিষদ, সারগাম, নৃত্যভূমি, চারুকণ্ঠসহ ডজনখানেক খ্যাতনামা সংগীত, নৃত্য ও আবৃত্তি দলের নাম থাকলেও বাস্তবে এদের কাউকেই মঞ্চে দেখা যায়নি! এমনকি নির্ধারিত যন্ত্রশিল্পীরাও অনুষ্ঠানে অনুপস্থিত ছিলেন। বাধ্য হয়ে অন্য লোক এনে কোনো রকমে যন্ত্রসঙ্গীত বাজানো হয়।
শিল্পী সমাজের সাধারণ সম্পাদক সাইফুর রহমান চৌধুরী পাপলু আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন,“একটি পরিবেশনার পেছনে রিহার্সাল, যাতায়াত ও নাস্তার বড় অংকের খরচ থাকে। অথচ শিল্পকলা থেকে যে সামান্য সম্মানী দেওয়া হয়, তা দিয়ে যাতায়াত ভাড়াও হয় না! উল্টো অভিভাবকদের গালি শুনতে হয় যে আমরা নাকি টাকা পকেটে পুরি।”
জানা গেছে, ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়ে জাসাসসহ একাধিক সংগঠন মিটিং করে একযোগে এই অনুষ্ঠান বর্জনের সিদ্ধান্ত নেয়।
এ বিষয়ে জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী ‘ফোক যুবরাজ’ সৈয়দ আশিক কড়া ভাষায় বলেন,“সব সংগঠন ও শিল্পীদের বয়কট করার ঘটনা অত্যন্ত দুঃখজনক। এই চরম সমন্বয়হীনতার দায় কালচারাল অফিসার কোনোভাবেই এড়াতে পারেন না। তাঁকে এর কৈফিয়ত দিতেই হবে।”
অভিযোগের পাহাড়ে চেপে বসা হবিগঞ্জ জেলা কালচারাল অফিসার অসিত বরণ দাশ গুপ্তের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য একাধিকবার কল করা হলেও তিনি মুঠোফোন রিসিভ না করে এড়িয়ে গেছেন।
সাংস্কৃতিক বোদ্ধাদের প্রশ্ন—সরকারি অনুদানের টাকা দিয়ে এভাবে খালি হলে দায়সারা আয়োজন আর কতদিন চলবে? কালচারাল অফিসারের স্বৈরাচারী মনোভাবের জবাবদিহিতা কি আদৌ হবে?
মীর্জা ইকবাল
মন্তব্য করুন: