কালোবাহিনীর কাছে জিম্মি যাদুকাটা,নেপথ্যে রানু মেম্বার
যাদুকাটা নদীর সুনীল জল আর তীরবর্তী জনপদকে গ্রাস করে নিয়েছে এক জীবন্ত দানব। সরকার যেখানে ভূমিহীন মানুষকে মাথা গোঁজার ঠাঁই করে দিয়েছিল, আজ সেখানে চলছে এক ভয়ঙ্কর উচ্ছেদ অভিযান। আর যাদুকাটা নদী ও তীরবর্তী পরিবেশ-প্রতিবেশের এই মহাধ্বংসযজ্ঞের নেপথ্যের মূল হোতা হিসেবে উঠে এসেছে স্থানীয় রানু মেম্বারের নাম। তার নেতৃত্বাধীন ‘কালাবাহিনী’র লোলুপ দৃষ্টি আর অমানবিক অত্যাচারে এখন নিশ্চিহ্ন হওয়ার পথে তাহিরপুরের ঘাগটিয়া আদর্শ গ্রাম।
১৯৯১-১৯৯২ সনে ঘাগটিয়া গ্রামের সরকারি খাস খতিয়ানের বিস্তৃত বালুচরে সরকার মাথা গোঁজার ঠাঁইহীন ভূমিহীনদের ঘর বানিয়ে বরাদ্দ দিয়েছিল। কিন্তু এই ঘরগুলোর নিচে থাকা বালুর স্তূপই এখন অসহায় মানুষদের জন্য অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই বালুকে ‘সোনার খনি’ বানিয়ে শত শত কোটি টাকা হাতিয়ে নিতে ক্ষমতার মদমত্ততায় অন্ধ রানু মেম্বার ও তার বাহিনী এখন মেতেছে বসতি উচ্ছেদের নারকীয় খেলায়।
বাসিন্দাদের বাধ্য করা হচ্ছে সরকারি বরাদ্দ পাওয়া বাড়ি ছেড়ে দিতে। নামমাত্র মূল্যে ভিটেমাটি লিখে দিতে অস্বীকার করলেই নিরীহ গ্রামবাসীদের ওপর নেমে আসে কালাবাহিনীর নির্মম ও পৈশাচিক নির্যাতন।
সংবাদ তথ্য অনুসারে, রানু মেম্বারের ত্রাসের রাজত্বের শিকার হয়ে ইতিমধ্যেই ঘাগটিয়া আদর্শ গ্রামের প্রায় অর্ধশত বাড়ি উচ্ছেদ হয়ে গেছে। বাকি যেগুলো টিকে আছে, সেগুলোও বালুখেকোদের আগ্রাসনে বিলীন হওয়ার অপেক্ষায়।
রানু মেম্বার ও তার কালাবাহিনীর ভয়ে পুরো এলাকার মানুষ এতটাই আতঙ্কিত ও জিম্মি যে, এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে মুখ খোলার সাহসও কারও নেই। একবার গ্রামের অধিবাসীরা মানববন্ধনের ডাক দিলেও, গভীর রাতে কালাবাহিনীর অস্ত্রের মহড়া ও খুনের হুমকির মুখে সেই কর্মসূচি পণ্ড হয়ে যায়।
সরকার ১৪৩২ বাংলা সনের জন্য যাদুকাটা-১ ও যাদুকাটা-২ বালুমহাল নির্দিষ্ট সীমানার মধ্যে সনাতন পদ্ধতিতে দিনের আলোতে বালু তোলার জন্য ইজারা দিয়েছিল। যেখানে ড্রেজার বা যান্ত্রিক খননযন্ত্র ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ, সেখানে রানু মেম্বারের ছত্রছায়ায় ইজারার সমস্ত শর্তকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে দিনরাত চলছে নিষিদ্ধ ড্রেজারের গর্জন। ইজারাকৃত এলাকা থেকে বহু দূরে অবস্থিত সরকারি আদর্শ গ্রামে কীভাবে ড্রেজার চলে, সেই প্রশ্ন এখন সচেতন মহলের।
অভিযোগ রয়েছে, এই অবৈধ খননযজ্ঞে বিআইডব্লিউটিএ’র একটি রহস্যজনক অনুমতিকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে বালুখেকোরা। যেখানে প্রচলিত আইনে ড্রেজার নিষিদ্ধ, সেখানে এই অনুমতি কীভাবে দেওয়া হলো তা নিয়ে তীব্র ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে। দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) দাখিল হওয়া এক অভিযোগপত্র অনুযায়ী, যাদুকাটা নদী থেকে ইতিমধ্যেই প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকার সরকারি ও ব্যক্তিগত সম্পদ লুণ্ঠন করেছে এই সিন্ডিকেট।
আইন অনুসারে সরকারি খাসজমি হস্তান্তর বা বিক্রি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ হলেও, প্রশাসনের নাকের ডগায় এই চরম দুর্বৃত্তায়ন চলছে। স্থানীয় প্রশাসনের এই প্রকাশ্য ব্যর্থতা ও নীরবতা নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে তীব্র ক্ষোভ।
জানা গেছে, রানু মেম্বারের এই ‘কালাবাহিনী’ গিরগিটির মতো রঙ বদলাতে ওস্তাদ। বিগত সরকারের আমলে তারা সাবেক সংসদ সদস্যদের সরাসরি আশ্রয়ে-প্রশ্রয়ে থেকে কোটি কোটি টাকার বালু লুট করেছে। পটপরিবর্তন হলেও তাদের প্রভাবে বিন্দুমাত্র ভাটা পড়েনি, বরং আরও ভয়ঙ্কর রূপে আবির্ভূত হয়েছে।
বর্তমান সংসদ সদস্য নদী তীরবর্তী এই বিশাল ধ্বংসযজ্ঞ ও গ্রাম রক্ষায় ইতিমধ্যেই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নিকট আবেদন জানিয়েছেন এবং নৌপুলিশের বিশেষ টিম ও কোস্টগার্ড নিয়োগের দাবি তুলেছেন। তবে স্থানীয়দের মতে, শুধু প্রশাসনিক তৎপরতা দিয়ে রানু মেম্বারের এই নেটওয়ার্ক ভাঙা অসম্ভব, যদি না এর পেছনে থাকা রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা পুরোপুরি বন্ধ করা যায়।
রানু মেম্বার ও তার সিন্ডিকেটের এই সর্বনাশা বালু লুণ্ঠন থামাতে না পারলে শুধু ঘাগটিয়া আদর্শ গ্রামই নয়, লাউড়েরগড় উত্তরপাড়া, ডালারপাড়, রাজারগাঁও, বিন্নাকুলি, জালেরটেক, গড়কাঠি, ঘাগড়া, মানিগাঁও আদর্শগ্রাম, নোয়াগাঁও আদর্শগ্রাম এবং সুনামগঞ্জের অন্যতম প্রধান পর্যটন আকর্ষণ অপার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যমণ্ডিত বৃহৎ শিমুল বাগানও অচিরেই নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে।
জেলা পুলিশ সুপারের মতে, ইজারাদানকারী কর্তৃপক্ষ কঠোর ও কার্যকর ব্যবস্থা নিলে এই সমস্যার ৮০ শতাংশ সমাধান সম্ভব। কিন্তু পরিবেশবিদ ও স্থানীয় ভুক্তভোগীদের দাবি—যাদুকাটা নদী, বিপন্ন পরিবেশ এবং ভিটেমাটি হারানো নিরীহ মানুষকে বাঁচাতে হলে আগে এই ধ্বংসযজ্ঞের মূল হোতা রানু মেম্বার ও তার সশস্ত্র কালাবাহিনীকে অবিলম্বে গ্রেপ্তার করে আইনের মুখোমুখি করতে হবে। অন্যথায় তাহিরপুরের এই সীমান্ত জনপদ অসংখ্য মানুষের হাহাকার ও অশ্রুসজল ইতিহাসে পরিণত হবে।
লতিফুর রহমান রাজু/ সজল
মন্তব্য করুন: