সুনামগঞ্জে এক বছরে মামলা নিষ্পত্তি বেড়েছে ৮৯০%

সুনামগঞ্জে এক বছরে মামলা নিষ্পত্তি বেড়েছে ৮৯০%

নিজস্ব প্রতিনিধি,সুনামগঞ্জ

১৩/০৭/২০২৬ ১৮:১৮:০৮

প্রধান উপদেষ্টা পদত্যাগ করবেন না: ফাইজ তাইয়েব আহমেদ

সুনামগঞ্জে বাধ্যতামূলক প্রি-কেস মেডিয়েশন (মামলা পূর্ব আপোষ-মীমাংসা) চালুর পর বিরোধ নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে এক অভূতপূর্ব ও ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। বিগত বছরের তুলনায় চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে জেলা লিগ্যাল এইড অফিসের মাধ্যমে মামলা নিষ্পত্তি বেড়েছে প্রায় ৮৯০ শতাংশ এবং আপোষের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের আর্থিক আদায়ের পরিমাণ বেড়েছে ১,২২৩ শতাংশ।

​সোমবার (১৩ জুলাই) বেলা ২টায় জেলা লিগ্যাল এইড অফিসের সভাকক্ষে গণমাধ্যমকর্মীদের সাথে আয়োজিত এক মতবিনিময় ও সচেতনতামূলক সভায় লিখিত বক্তব্যে এসব তথ্য জানান জেলা লিগ্যাল এইড অফিসার (সিনিয়র সিভিল জজ) মো: জুনাইদ।


​সুনামগঞ্জে বাধ্যতামূলক মেডিয়েশন চালুর পর বদলে যাওয়া দৃশ্যপট শীর্ষক এই সভায় জেলা লিগ্যাল এইড অফিসার বলেন, আইনগত সহায়তা প্রদান (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫-এর মাধ্যমে বাধ্যতামূলক প্রি-কেস মেডিয়েশন চালুর পর সুনামগঞ্জে বিরোধ নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে একটি সুস্পষ্ট ও দৃশ্যমান বিপ্লব ঘটেছে। এটি কেবল শুষ্ক কোনো পরিসংখ্যান নয়। প্রতিটি নিষ্পত্তির পেছনে রয়েছে একটি পরিবারে শান্তি ফিরে আসার গল্প, একটি বিরোধের সৌহার্দ্যপূর্ণ অবসান এবং সাধারণ মানুষের দ্রুত ও বিনামূল্যে ন্যায়বিচার পাওয়ার বাস্তব অভিজ্ঞতা।

​মতবিনিময় সভায় জেলা লিগ্যাল এইড কার্যালয়ের পক্ষ থেকে বিগত ২০২৫ সালের জানুয়ারি, জুন এবং ২০২৬ সালের জানুয়ারি, জুন মাসের একটি তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরা হয়। সরকারি তথ্য অনুযায়ী ২০২৫ সালের প্রথম ছয় মাসে প্রি-কেস আবেদন যেখানে ছিল মাত্র ১৭১টি। ২০২৬ সালের একই সময়ে তা ৯৮১% বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে ১,৮৪৯টিতে। ২০২৫ সালে প্রি-কেস মীমাংসা হয়েছিল ৭৯টি, যা এবার ২৩৬% বৃদ্ধি পেয়ে ২৬৬টিতে উন্নীত হয়েছে। এছাড়া পোস্ট-কেস (মামলা পরবর্তী) মীমাংসা ৩০টি থেকে বৃদ্ধি পেয়ে হয়েছে ৭৭টি।

​সবচেয়ে বড় সাফল্য এসেছে সাধারণ মানুষের পাওনা টাকা আদায়ের ক্ষেত্রে। ২০২৫ সালের প্রথম ছয় মাসে লিগ্যাল এইডের মাধ্যমে আপোষে আর্থিক আদায়ের পরিমাণ ছিল মাত্র ২,০০,৯০০ টাকা, যা ২০২৬ সালের জুন নাগাদ ১,২২৩% প্রবৃদ্ধি অর্জন করে ২৬,৫৯,৮০০ টাকায় পৌঁছেছে। পাশাপাশি সরকারি আইনি সহায়তা গ্রহীতার সংখ্যা ১৫৭ জন থেকে ৩৭৫% বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭৪৬ জনে। সার্বিকভাবে মোট উপকারভোগীর সংখ্যা ১,৯৯৫ জন থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ২,৪৯০ জনে উন্নীত হয়েছে।

​লিগ্যাল এইডের মাধ্যমে সম্পাদিত আপোষনামার আইনি ভিত্তি তুলে ধরে সিনিয়র সিভিল জজ মো: জুনাইদ বলেন, অনেকের মধ্যে ভুল ধারণা রয়েছে যে লিগ্যাল এইড অফিসের আপোষনামা হয়তো একটি অনানুষ্ঠানিক সমঝোতা যার কোনো আইনি বাধ্যবাধকতা নেই। কিন্তু বাস্তবতা হল আইনগত সহায়তা প্রদান আইন অনুযায়ী এই আপোষনামা একটি দেওয়ানি আদালতের চূড়ান্ত ডিক্রীর সমমর্যাদা লাভ করে। কোনো পক্ষ চুক্তির শর্ত ভঙ্গ করলে অপর পক্ষ আদালতের ডিক্রীর ন্যায় তা সরাসরি কার্যকর বা জারি করানোর আইনি অধিকার রাখেন।

​তিনি আরও জানান, মীমাংসা প্রক্রিয়া চলাকালীন কোনো পক্ষের বৈধ স্বার্থ বা সম্পত্তি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিলে লিগ্যাল এইড অফিসারের অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ প্রদানের ক্ষমতা রয়েছে। এই ডিক্রীর মর্যাদা ও অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ দেওয়ার আইনি ক্ষমতাই লিগ্যাল এইডকে আদালতের একটি দ্রুততর, সহজলভ্য ও কার্যকর সম্প্রসারিত রূপ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

​বাধ্যতামূলক মেডিয়েশনের ফলে পক্ষসমূহের বিপুল সময় ও অর্থ সাশ্রয় হচ্ছে। আদালতে নতুন মামলার জট ও চাপ কমছে এবং সামাজিক সম্প্রীতি সুদৃঢ় হচ্ছে উল্লেখ করে জেলা লিগ্যাল এইড অফিসার বিচারপ্রার্থী ও সাধারণ মানুষকে মামলা দায়েরের আগে লিগ্যাল এইড অফিসে আসার আহ্বান জানান। এই ইতিবাচক পরিবর্তনকে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছে দিতে তিনি সংবাদমাধ্যম ও সাংবাদিকদের লিগ্যাল এইডের মানবিক ও সফল গল্পগুলো বেশি বেশি প্রচার করার বিনীত অনুরোধ করেন।

​"মামলা নয়, মীমাংসাই হোক প্রথম পছন্দ" এই স্লোগানকে সামনে রেখে জেলা লিগ্যাল এইড কমিটির চেয়ারম্যান, বিচার বিভাগ, জেলা প্রশাসন, জেলা আইনজীবী সমিতি ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সহযোগিতায় সুনামগঞ্জকে সংলাপ ও সমঝোতার একটি আদর্শ জেলা হিসেবে গড়ে তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। সভায় জেলার সিনিয়র সাংবাদিকবৃন্দসহ বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষ উপস্থিত ছিলেন।


প্রীতম দাস / সজল

মন্তব্য করুন:

Led Bottom Ad
Led Bottom Ad