তিন পয়েন্টে বিপদ সীমার উপরে
সিলেট অঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতি আরও অবনতির শঙ্কা
উজানে ভারতের মেঘালয় ও আসামে ভারী বৃষ্টিপাত এবং সিলেট অঞ্চলে টানা বর্ষণের প্রভাবে সিলেট, সুনামগঞ্জ ও পার্শ্ববর্তী এলাকায় বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। ইতোমধ্যে সুরমা, কুশিয়ারা নদীর তিনটি পয়েন্টে পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র (এফএফডব্লিউসি) জানিয়েছে, আগামী দুই দিন সুরমা-কুশিয়ারা অববাহিকার নদ-নদীর পানি আরও বাড়তে পারে, ফলে সিলেট ও সুনামগঞ্জের নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা অবনতি হতে পারে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, কুশিয়ারা নদীর ফেঞ্চুগঞ্জ পয়েন্টে পানি বিপদসীমার ২৭ সেন্টিমিটার, সুনামগঞ্জের মারকুলিতে ৭ সেন্টিমিটার, সুরমা নদীর ছাতক পয়েন্টে ১৫ সেন্টিমিটার এবং নেত্রকোনার কলমাকান্দায় সোমেশ্বরী নদীর পানি ৮ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
সিলেট পানি উন্নয়ন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, সোমবার সন্ধ্যা ৬টায় কুশিয়ারা নদীর ফেঞ্চুগঞ্জ পয়েন্টে পানির উচ্চতা ছিল ৯ দশমিক ৭২ মিটার, যা বিপদসীমার ওপরে রয়েছে। তবে সুরমা নদীর কানাইঘাট ও সিলেট স্টেশন এবং কুশিয়ারা নদীর শেরপুর স্টেশনে পানি এখনও বিপদসীমার নিচে থাকলেও সতর্ক অবস্থায় রয়েছে।
এদিকে, সুনামগঞ্জে টানা বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে জেলার বিভিন্ন নদীর পানি দ্রুত বাড়ছে। ছাতক এলাকায় সুরমা নদীর পানি বিপদসীমার ১৫ সেন্টিমিটার এবং দিরাইয়ের মারকুলিতে কুশিয়ারা নদীর পানি ৭ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। গত ২৪ ঘণ্টায় সুনামগঞ্জে ৭৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। জেলার সীমান্তবর্তী বিভিন্ন সড়ক প্লাবিত হওয়ায় মানুষের দুর্ভোগ বেড়েছে। বিশেষ করে সুনামগঞ্জ-তাহিরপুর সড়কের শক্তিয়ারখলা ও দুর্গাপুর অংশ এবং সদর উপজেলার ডুলরা-ইব্রাহিমপুর সড়কে যান চলাচল ব্যাহত হচ্ছে।
ভারতের মেঘালয়ের চেরাপুঞ্জি ও মৌসিনরাম এলাকায় কয়েক দিনের টানা ভারী বৃষ্টির কারণে উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে সুনামগঞ্জের সার্বিক বন্যা পরিস্থিতি আরও অবনতির দিকে যাচ্ছে। ঢলের পানিতে আবারও তলিয়ে গেছে সুনামগঞ্জ-তাহিরপুর সড়কের শক্তিয়ারখলা ও দুর্গাপুর অংশ। পাহাড়ি ঢলের পানি দ্রুত ভাটিতে নেমে যাওয়ার সুবিধার্থে সড়কের এই অংশ নিচু করে নির্মাণ করা হয়েছিল। ফলে উজানে ভারী বৃষ্টিপাত হলেই সড়কটি পানির নিচে চলে যায়। গত এক সপ্তাহে দ্বিতীয়বারের মতো এ অংশ প্লাবিত হওয়ায় যান চলাচলে ব্যাপক বিঘœ সৃষ্টি হয়েছে।
এদিকে সদর উপজেলার ডুলরা-ইব্রাহিমপুর সড়কও বন্যার পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় সীমান্তবর্তী ইউনিয়নগুলোর সঙ্গে জেলা শহরের যোগাযোগ কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। ওই সড়কে সব ধরনের যান চলাচল বন্ধ রয়েছে। এছাড়া দোয়ারাবাজার ও ছাতক উপজেলার সীমান্তঘেঁষা কয়েকটি গ্রামীণ সড়কও পানিতে ডুবে যাওয়ায় স্থানীয় বাসিন্দাদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।
সদর উপজেলার সৈয়দপুর গ্রামের বাসিন্দা আবুল খায়ের বলেন, সীমান্ত এলাকার সুরমা ও জাহাঙ্গীরনগর ইউনিয়নের বাসিন্দাদের জেলা শহরে যাতায়াতের প্রধান পথ কৃষ্ণনগর-সৈয়দপুর-ইব্রাহিমপুর সড়ক। কিন্তু সড়কের একাধিক স্থান পানির নিচে চলে যাওয়ায় মানুষকে বিকল্প ও ঝুঁকিপূর্ণ পথে চলাচল করতে হচ্ছে।
এদিকে সুনামগঞ্জের স্থানীয় প্রশাসন সূত্র জানায়, সম্ভাব্য বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় উপজেলা প্রশাসনকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। জেলার ১ হাজার ৩১১টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে প্রস্তুত রাখা হয়েছে। উদ্ধারকাজে পর্যাপ্ত নৌযান, স্বেচ্ছাসেবক এবং ১ হাজার ৫৬টি মেডিক্যাল টিম প্রস্তুত রয়েছে। এছাড়া জেলার ১২টি উপজেলায় ইতোমধ্যে ১ হাজার ২০০ প্যাকেট শুকনা খাবার ও জিআর চাল পাঠানো হয়েছে। প্রয়োজনীয় ত্রাণসামগ্রীও মজুত রাখা হয়েছে বলে তিনি জানান।
এদিকে, হবিগঞ্জে খোয়াই নদীর বাঁধ ভেঙে সৃষ্ট বন্যা পরিস্থিতি এখনো স্বাভাবিক হয়নি। প্রায় ৩০ হাজার মানুষ এবং ৬ হাজার ৪০০ পরিবার পানিবন্দী রয়েছে। নিম্নাঞ্চলের বহু গ্রাম এখনও দুই থেকে আড়াই ফুট পানির নিচে। পানিবন্দী মানুষের জন্য ১ হাজার ৬০০টি শুকনা খাবারের প্যাকেট, ৩০ মেট্রিক টন চাল ও নগদ দুই লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হলেও স্থানীয়দের অভিযোগ, তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল।
আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, আগামী ২৪ ঘণ্টায় সিলেট অঞ্চলের আকাশ আংশিক মেঘলা থেকে সাময়িকভাবে মেঘাচ্ছন্ন থাকতে পারে। বিভাগের অনেক স্থানে দমকা হাওয়াসহ হালকা থেকে মাঝারি বৃষ্টি এবং কোথাও কোথাও মাঝারি ভারী থেকে ভারী বর্ষণের সম্ভাবনা রয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় সিলেটে ২৭ দশমিক ৫ মিলিমিটার এবং সোমবার সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত আরও ৩৯ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।
বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, আগামী ২৪ ঘণ্টায় সিলেট, ময়মনসিংহ ও রংপুর বিভাগ এবং ভারতের মেঘালয়, আসাম ও পশ্চিমবঙ্গে ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। এর প্রভাবে আগামী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টায় সিলেট, সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা, শেরপুর ও ময়মনসিংহ জেলার সারিগোয়াইন, যাদুকাটা, সোমেশ্বরী ও ভুগাই-কংসসহ বিভিন্ন নদীর পানি আরও বেড়ে কয়েকটি স্থানে বিপদসীমা অতিক্রম করতে পারে এবং স্বল্পমেয়াদি বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে।
এদিকে, ভারতের আবহাওয়া বিভাগ (আইএমডি) মেঘালয়, আসাম, পশ্চিমবঙ্গসহ উত্তর-পূর্বাঞ্চলে আগামী ২৪ ঘণ্টায় ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টিপাতের সতর্কতা জারি করেছে। মেঘালয় ও আসামে আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসের ঝুঁকির কথাও বলা হয়েছে।
সর্বশেষ বৃষ্টিপাতের হিসাবে, ভারতের মেঘালয়ের মাওকিরওয়াতে ১১৫ মিলিমিটার, মৌসিনরামে ১১১ মিলিমিটার, সোহরা (চেরাপুঞ্জি) এলাকায় ১০৮ মিলিমিটার, শেল্লায় ৮০ মিলিমিটার এবং উইলিয়ামনগরে ৮০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়েছে। এই প্রবল বর্ষণ থেকেই সুরমা-কুশিয়ারা অববাহিকায় পাহাড়ি ঢল নেমে বাংলাদেশে নদীর পানি দ্রুত বাড়ছে।
জেলা প্রশাসন ও স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে, সম্ভাব্য বন্যা মোকাবিলায় আশ্রয়কেন্দ্র, উদ্ধার নৌযান, মেডিক্যাল টিম ও ত্রাণসামগ্রী প্রস্তুত রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলের বাসিন্দাদের পরিস্থিতির দিকে সতর্ক নজর রাখতে এবং প্রয়োজন হলে দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যাওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী এমদাদুল হক বলেন, ‘উজানে ভারী বৃষ্টির কারণে নদ-নদীর পানি বাড়ছে। আগামী ৪৮ ঘণ্টা পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। বৃষ্টি অব্যাহত থাকলে স্বল্পমেয়াদি বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হতে পারে।’
সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মিনহাজুর রহমান বলেন, ‘বন্যা মোকাবিলায় জেলার সব উপজেলা প্রশাসনকে প্রস্তুত থাকতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। আশ্রয়কেন্দ্র, মেডিক্যাল টিম, নৌযান ও ত্রাণসামগ্রী প্রস্তুত রাখা হয়েছে।’
মীর্জা ইকবাল
মন্তব্য করুন: