সুমন বনিক এর গুচ্ছ কবিতা ‘প্রেতের নগরে ও অন্যান্য’
প্রেতের নগরে
*
পূর্ণিমার এক রাতে
সুরমার বুকে নেমে এসেছিল চাঁদ—
একাকী, মায়াবী, নিঃশব্দ দীপ্তি।
হঠাৎ ছায়ামানবেরা ঝাঁপিয়ে পড়ে
ভূত? না, প্রেতাত্মা!
আদতে ওরা, চাঁদটাকেই খেতে এসেছিল
সুরমার জল ঘোলা করে।
শেষতক,
ঘোলাটে জলে চাঁদের মৃত্যু ঘটে
নিভে যায় এক অপার সৌন্দর্য।
সেই থেকে প্রেতের নগরে
জ্যোৎস্না আসে না আর
নাগর হেঁটে চলে অন্ধকারে—
আলো খুঁজে, আলো পায় না
কঙ্কাল কথা বলছে
*
একটা কঙ্কাল আমার পড়ার টেবিলের পাশে
দেয়ালে গা লাগিয়ে ঝুলে আছে,
সিলিংফ্যানের হাওয়ায় টুং টাং শব্দে
মাঝেমধ্যে নড়াচড়া করে
কী যেন বলতে চায়!
একদিন ওর হাড়গোড়ে
মাংসের পলিমাটিমোড়া ছিল,
বুকে ছিল সমুদ্রের গর্জন—শান্ত-স্নিগ্ধ নদী
গোলাপের বাগান—হিংসের অগ্নিকুণ্ড,
নাকি সরল বৃক্ষের মতো কোনো মহামানব!
ঘোর লাগে
মগজে সমুদ্রের উথালপাথাল ঢেউ।
একদিন কঙ্কালটি কবরে শুয়ে ছিল
মোহমায়ার চাদর জড়িয়ে।
কঙ্কালের ধর্মের ঠিকুজি নেই—জৌলুস নেই,
বিত্তবৈভবের ফুটানি নেই
শুধু ইতিহাস পাঁজরে গেঁথে
শুয়ে থাকে মাটির ঘরে।
কঙ্কালের জাতপাত আছে নাকি—
মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে!
যতিহীন
*
ইদানিং রাতে ঠিকঠাক ঘুমোতে পারি না
মৃতমানুষগুলো দরজায় কড়া নাড়ে,
ঘুমের ঘোরে আলোর রোশনাই ঢেলে
ফেলে যাওয়া কাজের ফিরিস্তি খুলে বসে,
কর্মপাগল মানুষগুলো কেন যে জ্বালায়!
ফটিকঘরে
চায়ের পেয়ালায় চুমুক দিতে দিতে ওঁরা বলল—
জীবনটা তো
টোস্ট-বিস্কুট চুবিয়ে চুবিয়ে চা পানের মতোই;
ক্ষণিকের আপ্যায়ন!
আদতে মানুষের কোনো মৃত্যু নেই,
মহাকালের যাত্রি মানুষ
ফুল আর ফসলের চাষি
আগুন
*
মা উন্দালে মাটির সড়া চাপিয়ে
খই-মুড়ি ভাজেন,
ধানের খোসা ফুঁড়ে বকুলফুলের মতো
খই-মুড়ি ফুটে ওঠে,
এক কড়াই ভাজাফুলের গন্ধে
উন্মাদনা আমার চোখেমুখে!
উনুনে সেই আগুনের আঁচ
আজও লেপ্টে আছে দেহজুড়ে,
আগুনের আঁচে মায়ের শরীরের ঘ্রাণ শুঁকি;
জলের মতো
গায়ে প্রশান্তি মেখে দেয়।
সময়ের চৌকাঠ পেরিয়ে দেখি
চারিদিকে আগুনের লেলিহান শিখা,
হৃদয়ে দহন
ধরিত্রীর দেহজুড়ে দগদগে ঘা।
মা, আমাকে সেই আগুনের পরশমণি দিয়ে যাও
পরকীয়া
*
বিষের ডালি সাজিয়ে
বসে আছে সে কোন চাণক্যের বিষকন্যা!
অথচ,খন্নাসের চোখ
দেখে শুধু অমৃতসাগর।
মধুপায়ী পতঙ্গ ভিড় করে
মৌচাকের গুহায় গুহায়,
মোহের ঠুলি সেঁটে
কামের উত্তাপে
হাবুডুবু খায় কামিনির জলে।
রাতের চিতায় পুড়ে পুড়ে
ভস্ম হয়ে যায়
কত সোনার সংসার
দুষ্টু কোকিল পরকীয়া বোঝে;
ডিম পাড়ার সময় এলে—
কাকের বাসা খোঁজে।
_________________
কবি পরিচিতি : সুমন বনিক। সিলেট শহরের মহাজনপট্টিতে ৩১ আগস্ট ১৯৬৭ খ্রিস্টাব্দে জন্ম। তিনি মূলত কবি। কবিতার সঙ্গে পথচলা তিন দশকের। তিনি বাউলের গুহ্য-সাধনার তত্ত্ব তালাশে নিমগ্ন। কবিতার পাশাপাশি অসংখ্য ছড়া, কিশোর কবিতা, ছোটদের গল্প লিখেছেন । সাহিত্যের ছোটকাগজ অগ্নিশিখা সম্পাদক, অগ্নিশিখার প্রথম প্রকাশ ১৯৮৭। প্রকাশিত কবিতা বই চারটি : জ্বলছি জলের তলে, প্রেমযোগ, অবেলায় ডোরবেল, প্রণয়সোহাগ। এবং
কিশোর কবিতার বই 'রাতের গায়ে জোনাক জ্বলে', যৌথ ছড়ার বই 'ছন্দ ছড়ায় আড্ডা ঘর'।
'বগুড়া লেখক চক্র পুরস্কার' ও "কাব্যকথা সাহিত্য পুরস্কার' অর্জন করেছেন। দীর্ঘদিন যাবৎ সম্পাদনা করছেন পূজাসংখ্যা "অরুণ আলোর অঞ্জলি" সংকলন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়ালেখা শেষ করে কলেজে শিক্ষকতা দিয়ে পেশাজীবন শুরু করেন। বর্তমানে তিনি ব্যাংকিং পেশায় নিয়োজিত।
প্রথম সিলেট সাহিত্য ডেস্ক
মন্তব্য করুন: