“‘ফগা’ শব্দের আড়ালে লুকানো বিদ্রোহ: মৌলভীবাজারের গৌরবগাঁথা”
আড্ডায়, ঠাট্টায় কিংবা আঞ্চলিক কথোপকথনে—মৌলভীবাজারের মানুষকে ‘ফগা’ বলে সম্বোধন করা নতুন কিছু নয়। অনেকেই এই শব্দটিকে হালকা বিদ্রূপ হিসেবে ব্যবহার করেন, যেন এটি সরলতা কিংবা বোকামির প্রতীক। কিন্তু ইতিহাসের গভীরে প্রবেশ করলে দেখা যায়, এই ‘ফগা’ নামের ভেতরই লুকিয়ে আছে এক বিস্ময়কর রাজনৈতিক বুদ্ধিমত্তা, সাহস এবং দেশপ্রেমের অনন্য কাহিনী—যা আজও গর্বের সঙ্গে উচ্চারণ করার মতো।
সময়টা ১৯১৯ সাল। উপমহাদেশ জুড়ে তখন ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের উত্তাল ঢেউ। অসহযোগ আন্দোলনের ডাক মানুষের অন্তরে আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছে। ঠিক তখনই ব্রিটিশ শাসকগোষ্ঠী কৌশলে মানুষের দৃষ্টি ঘুরিয়ে দিতে ঘোষণা দেয় ‘আসাম প্রাদেশিক আইন সভা’ নির্বাচন। তাদের উদ্দেশ্য ছিল পরিষ্কার—রাজনৈতিক আন্দোলনের তীব্রতা কমানো এবং নিজেদের নিয়ন্ত্রণকে বৈধতার আবরণে ঢেকে রাখা।
কিন্তু মৌলভীবাজারের মানুষ তখন শুধু আবেগে নয়, বুদ্ধিতেও জেগে উঠেছিল।
স্থানীয় শিক্ষিত সমাজ, সচেতন তরুণরা এবং রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় ব্যক্তিরা একত্রে ভাবতে শুরু করলেন—এই নির্বাচনকে কীভাবে প্রতিহত করা যায়? সরাসরি বিরোধিতা নয়, তারা বেছে নিলেন ব্যঙ্গের ভাষা, প্রতিবাদের অভিনব কৌশল। সিদ্ধান্ত হলো—এই নির্বাচনে কোনো শিক্ষিত, সম্মানিত ব্যক্তি অংশ নেবেন না। বরং সমাজের এমন একজনকে সামনে আনা হবে, যাকে এই তথাকথিত ব্যবস্থায় ‘অযোগ্য’ বলে মনে করা হয়।
এভাবেই ইতিহাসের মঞ্চে উঠে আসেন চিরতন মুচি—একজন নিরক্ষর, অবহেলিত, সমাজের প্রান্তিক মানুষ।
কিন্তু এই প্রার্থিতা ছিল না কেবল একটি নামমাত্র অংশগ্রহণ; এটি ছিল একটি সুপরিকল্পিত প্রতিবাদ। জনগণ বুঝে-শুনে, সচেতনভাবেই তাকে ভোট দেন। ১৯১৯ সালের নভেম্বরের সেই নির্বাচনে চিরতন মুচি বিপুল ভোটে জয়লাভ করেন এবং আসাম প্রাদেশিক আইন সভার সদস্য নির্বাচিত হন।
এই এক ঘটনায় কেঁপে ওঠে ব্রিটিশদের তথাকথিত গণতন্ত্রের ভিত।
বিশ্বের সামনে উন্মোচিত হয় এক নির্মম সত্য—যে ব্যবস্থাকে তারা গণতন্ত্র বলে প্রচার করছিল, তা আসলে ছিল একটি প্রহসন। মৌলভীবাজারের সাধারণ মানুষ তাদের ভোটের মাধ্যমে সেই প্রহসনকে নগ্ন করে দেয়।
কিন্তু ইতিহাসের এই গৌরবময় অধ্যায়ের ঠিক পরেই শুরু হয় অন্য এক গল্প—বিদ্রূপের গল্প।
ব্রিটিশপন্থী গোষ্ঠী এবং বিরোধীরা মৌলভীবাজারের মানুষকে ‘ফগা’ বলে তিরস্কার করতে শুরু করে। শব্দটির ভেতরে ঢুকিয়ে দেওয়া হয় ‘বোকা’ বা ‘সহজ-সরল’ হওয়ার অর্থ। ধীরে ধীরে সেই শব্দ ছড়িয়ে পড়ে, আর প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে অনেকে এর প্রকৃত ইতিহাস ভুলে গিয়ে এটিকে অপমান হিসেবেই ব্যবহার করতে থাকে।
কিন্তু সত্যটা ছিল একেবারেই ভিন্ন।
এটি ছিল এক সচেতন সমাজের নিঃশব্দ বিদ্রোহ—যেখানে অস্ত্র ছিল না, ছিল বুদ্ধি; যেখানে সহিংসতা ছিল না, ছিল কৌশল। মৌলভীবাজারের মানুষ দেখিয়ে দিয়েছিল, প্রতিবাদ মানেই সবসময় স্লোগান নয়; কখনো কখনো একটি ভোটই হয়ে উঠতে পারে সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিরোধ।
এই ঘটনার প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে দেশের অন্যান্য অঞ্চলেও। সুনামগঞ্জ, নোয়াখালী, কুমিল্লা—বিভিন্ন জায়গায় সাধারণ, অবহেলিত মানুষদের নির্বাচিত করে একইভাবে ব্রিটিশ শাসনের প্রতি ব্যঙ্গ ও প্রতিবাদ জানানো হয়।
আজকের দিনে দাঁড়িয়ে, যখন ‘ফগা’ শব্দটি আবারও আলোচনায় আসে, তখন সময় এসেছে এর প্রকৃত অর্থকে নতুন করে চিনে নেওয়ার। এটি কোনো অপমান নয়, বরং একটি ইতিহাস—যেখানে লুকিয়ে আছে আত্মমর্যাদা, বুদ্ধিমত্তা আর দেশপ্রেমের দীপ্ত উদাহরণ।
মৌলভীবাজারের মানুষ সেদিন বোকা ছিলেন না—তারা ছিলেন সময়ের চেয়ে এগিয়ে থাকা এক সাহসী প্রজন্ম। আর ‘ফগা’? সেটি বিদ্রূপ নয়, সেটি এক গর্বের নাম—একটি নিঃশব্দ বিপ্লবের স্মারক।
ডি আর ডি
মন্তব্য করুন: