সিলেটে শীর্ষ ৫০ মাদক কারবারির তালিকায় প্রশাসনের নজর

সীমান্তে রামরাজত্ব

সিলেটে শীর্ষ ৫০ মাদক কারবারির তালিকায় প্রশাসনের নজর

আশিস রহমান,নিজস্ব প্রতিবেদক

০৩/০৯/২০২৬ ০৪:০১:৪৮

প্রধান উপদেষ্টা পদত্যাগ করবেন না: ফাইজ তাইয়েব আহমেদ

সীমান্ত পেরিয়ে বানের পানির মতো ঢুকছে ভয়াবহ সব মাদকদ্রব্য ও চোরাচালানের পণ্য। ইয়াবা, ফেনসিডিল, হেরোইন থেকে শুরু করে বিভিন্ন চোরাই পণ্যের রমরমা কারবারে আচ্ছন্ন সীমান্তঘেঁষা জেলা সিলেট। দিন শেষে সন্ধ্যা নামলেই নগরের মোড়ে মোড়ে জমে ওঠে মাদকসেবীদের মহোৎসব। সম্প্রতি সিলেটে ঘটে যাওয়া একাধিক নৃশংস ও চাঞ্চল্যকর অপরাধের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে মাদকের ভয়াবহ থাবা। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরদারি থাকলেও এই অপতৎপরতার লাগাম কোনোভাবেই টানা যাচ্ছে না।

অনুসন্ধানে জানা যায়, প্রতিদিন রাতের আঁধারে সীমান্ত গলিয়ে আসা বিপুল পরিমাণ চোরাচালানের পণ্য ট্রাকযোগে সিলেট শহর হয়ে ছড়িয়ে পড়ছে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। সীমান্তভিত্তিক এই অসাধু চক্রের কারণে যেমন দেশীয় ব্যবসায়ীরা মারাত্মক আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন, তেমনি সরকার হারাচ্ছে মোটা অঙ্কের রাজস্ব।

সাম্প্রতিক বেশ কয়েকটি আলোচিত ঘটনার তদন্তে অপরাধীদের সঙ্গে মাদকের সরাসরি সম্পৃক্ততা পেয়েছেন তদন্তকারীরা। নগরের রায়নগরে বহুল আলোচিত ট্রিপল মার্ডারের ঘটনায় গ্রেপ্তার রংমিস্ত্রি বাবুল মিয়া একজন পেশাদার মাদকসেবনকারী। অপরাধ সংঘটিত করার পর সে দলদলি চা বাগানে গিয়ে কয়েক ঘণ্টা অবস্থান করে মাদক সেবন করে। পরবর্তীতে ওখান থেকেই বাসার মালিককে ফোন করে ভাড়ার পাওনা টাকা পরিশোধের কথা জানায় সে।

একইভাবে শাহপরানে ব্যবসায়ী শাহাদাত হোসেন হত্যা মামলার অভিযুক্ত আসামি জালাল আহমদ এবং নগরের কীনব্রিজ এলাকায় র‍্যাব সদস্য ইমন আচার্য খুনের ঘটনায় গ্রেপ্তার হওয়া আসাদুল হক বাপ্পিও সরাসরি মাদকের সঙ্গে জড়িত। পুলিশ জানায়, বাপ্পি কীনব্রিজ এলাকায় প্রকাশ্যে মাদক বিক্রির পাশাপাশি একটি ছিনতাইকারী চক্রের নেতৃত্ব দিত। উক্ত ঘটনার পর কীনব্রিজ এলাকায় অস্থায়ী পুলিশ ক্যাম্প বসাতে বাধ্য হয় প্রশাসন। নগরজুড়ে বৃদ্ধি পাওয়া ছিনতাই ও অপরাধপ্রবণতার সিংহভাগই মাদককারবারিদের পৃষ্ঠপোষকতায় ঘটছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

পুলিশের জিরো টলারেন্স নীতি ও স্থানীয় বাসিন্দাদের নানা প্রতিরোধ সত্ত্বেও থামছে না মাদকের দৌরাত্ম্য। নগরের কাস্টঘরের বিতর্কিত ‘মাদক হাট’ গুঁড়িয়ে দেওয়া হলেও মাদক ব্যবসায়ীরা কৌশল বদলে স্থান পরিবর্তন করেছে। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সন্ধ্যা নামলেই নগরের বালুচর ইকোপার্ক, উপ-শহরের এইচ ব্লক, বুরহানউদ্দিন রুট, দলদলি চা বাগান, বিমানবন্দর সড়ক, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা এবং দক্ষিণ সুরমার বেশ কিছু নির্জন এলাকা মাদকসেবী ও কারবারিদের দখলে চলে যায়। রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়া এবং ক্ষেত্রবিশেষে মাঠ পর্যায়ের কিছু অসাধু পুলিশ সদস্যের অনৈতিক সম্পর্কের কারণেই এই বাণিজ্য টিকিয়ে রাখা সম্ভব হচ্ছে বলে জোর অভিযোগ রয়েছে।

সিলেটের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা ও মাদক পরিস্থিতি নিয়ে ইতিমধ্যে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সরকারের উচ্চপর্যায়ের নীতিপ্রণেতারা। সম্প্রতি সিলেট সফরকালে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করে জিরো টলারেন্স নীতির ভিত্তিতে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার তাগিদ দেন।

এর আগে রায়নগরে ট্রিপল মার্ডারের পর সিলেট-১ আসনের সংসদ সদস্য ও বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির সিলেটে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের নিয়ে বিশেষ বৈঠক করেন। সার্কিট হাউজে অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে তিনি জানান, সিলেট মেট্রোপলিটন এলাকা থেকে শীর্ষ ৫০ জন মাদক ব্যবসায়ীর তালিকা তৈরি করে তাদের বিরুদ্ধে চিরুনি অভিযানে নামার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

বাণিজ্যমন্ত্রী আশা প্রকাশ করে বলেন, “শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট ও কঠোর অভিযান চালানো গেলে এক থেকে দেড় মাসের মধ্যে সিলেটের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দৃশ্যমান অগ্রগতি সম্ভব।” একই সঙ্গে সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের (এসএমপি) কর্মপরিধি বিশাল হওয়ায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর লজিস্টিক সহায়তা ও যানবাহন সরবরাহ বাড়াতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বিশেষ দৃষ্টি আকর্ষণ করেন তিনি।

যোগাযোগ করা হলে সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (মিডিয়া) মঞ্জুরুল আলম প্রথম সিলেটকে জানান, সিলেটে ঘটে যাওয়া সাম্প্রতিক অনেক অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার নেপথ্যেই মাদকের সংযোগ পাওয়া গেছে।

তিনি বলেন, “মাদক ব্যবসায়ী ও সেবীদের বিরুদ্ধে পুলিশের আইনি কার্যক্রম সার্বক্ষণিক চলমান রয়েছে। সরকারের উচ্চপর্যায়ের নির্দেশনার পর অভিযান আরও জোরদার করা হয়েছে। তালিকাভুক্ত মাদককারবারিদের জালে তুলতে সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশ ও র‍্যাব যৌথভাবে কঠোর অভিযানে নামছে।”

নীরব চাকলাদার

মন্তব্য করুন:

Led Bottom Ad
Led Bottom Ad