প্রসঙ্গ হিজড়া: নকল পরিচয়ে আসল চাঁদাবাজি
একটি মধ্যবিত্ত পরিবারে নতুন সন্তানের জন্ম হয়েছে, কিংবা কোনো ব্যবসায়ী নতুন শোরুম খুলেছেন, অথবা ধুমধাম করে একটি বিয়ের আয়োজন চলছে, আমাদের সমাজে এসব আনন্দঘন মুহূর্তের সমার্থক শব্দ এখন এক চরম আতঙ্ক। এই আতঙ্কের নাম ‘হিজড়াদের উৎপাত’। আনন্দের উৎসব নিমেষেই রূপ নেয় এক বিভীষিকাময় চাঁদাবাজিতে। আর দাবিকৃত মোটা অঙ্কের টাকা না দিলেই শুরু হয় চরম অসভ্যতা। শিশু, বৃদ্ধ, নারী কিংবা যুবকের সামনে জনসম্মুখে কাপড় খুলে নগ্ন হওয়ার ভয় দেখানো, নোংরা অঙ্গভঙ্গি করা এবং রাস্তায় শুয়ে পড়ে ব্ল্যাকমেইল করার এই দৃশ্য আজ এ দেশের প্রতিটি নাগরিকের জন্য নিত্যদিনের এক পীড়াদায়ক বাস্তবতা।
প্রশ্ন হলো, একটি সভ্য স্বাধীন দেশে অধিকার আদায়ের নামে এমন আদিম ও বর্বর আচরণ কীভাবে বছরের পর বছর ধরে চলতে পারে?
২০১৩ সালে বাংলাদেশ সরকার হিজড়াদের তৃতীয় লিঙ্গ হিসেবে আইনি স্বীকৃতি দিয়েছে। উদ্দেশ্য ছিল মানবতাবাদী, যাতে এই প্রান্তিক জনগোষ্ঠী মূল স্রোতে ফিরতে পারে, শিক্ষা দীক্ষায় ও কর্মসংস্থানে সুযোগ পায়। কিন্তু আজ এক যুগ পর এসে দেখা যাচ্ছে, সেই আইনি স্বীকৃতি যেন সাধারণ মানুষকে জিম্মি করার এক লাইসেন্সে পরিণত হয়েছে। জোরপূর্বক টাকা আদায় এখন কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, এটি একটি সুসংগঠিত এবং লাভজনক অপরাধ চক্রে রূপ নিয়েছে।
সবচেয়ে ভয়াবহ তথ্যটি হলো, এই হিজড়া জনগোষ্ঠীর বড় একটি অংশই আসলে প্রকৃত হিজড়া বা আন্তঃলিঙ্গ নয়। বিভিন্ন সময়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদন্তে বেরিয়ে এসেছে যে, এক শ্রেণীর সুস্থ ও স্বাভাবিক পুরুষ কেবল মাত্র অল্প পরিশ্রমে বিপুল পরিমাণ টাকা আয়ের ধান্দায় নিজেদের চুল পোশাক বদলে নকল হিজড়া সেজে এই অপরাধে মেতে উঠেছে। তারা হিজড়াদের ঐতিহ্যবাহী গুরু শিষ্য প্রথাকে ব্যবহার করে রীতিমতো এলাকা ভাগ করে চাঁদাবাজির সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছে।
এই যে সমাজজুড়ে এত বড় একটা নৈরাজ্য চলছে, সেখানে আমাদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা কী? সাধারণ মানুষের মুখের ভাষা কেড়ে নেওয়া একটি নির্মম সত্য হল যে, এই সমাজে যেখানে টাকা ছাড়া সেবা মেলে না, সেখানে পুলিশের কাছে গিয়ে লাভ কী? আইন প্রয়োগের এই চরম শিথিলতা এবং দুর্নীতিই অপরাধীদের সাহস বাড়িয়ে দিয়েছে বহুগুণ। মানুষ লোকলজ্জা, ঝামেলা এড়ানো আর উৎসবের আমেজ নষ্ট না করার ভয়ে মুখ বুজে টাকা দিয়ে দেয়। ফলে, অপরাধের এই সংস্কৃতি ডালপালা মেলে আরও শক্তিশালী হচ্ছে।
আজ আমরা এমন এক ক্ষয়ে যাওয়া সমাজে বাস করছি, যার সর্ব অঙ্গে ক্ষত। যে ক্ষতের রক্ত ক্ষরন সমাজের প্রতিটি মানুষ টের পাচ্ছেন। যেখানে সৎ ও সাধারণ মানুষের জন্য প্রতিটি পদে পদে বেঁচে থাকা অত্যন্ত দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। নাগরিক নিরাপত্তার ন্যূনতম নিশ্চয়তা যেখানে নেই, সেখানে হিজড়াদের এই প্রকাশ্য উৎপাত আমাদের সামাজিক পচনের গভীরতাকে আরও স্পষ্ট করে তোলে। কিন্তু এভাবে আর কতদিন?
একটি সমাজকে পুরোপুরি ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচাতে হলে এই ক্ষতগুলোতে এখনই অস্ত্রোপচার করতে হবে। নকল হিজড়াদের চিহ্নিত করে চাঁদাবাজি ও শ্লীলতাহানির অপরাধে কঠোর শাস্তি দিতে হবে। জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ এবং স্থানীয় থানা প্রশাসনকে কোনো আর্থিক সুবিধা ছাড়াই নাগরিকদের তাৎক্ষণিক নিরাপত্তা দিতে বাধ্য থাকতে হবে। এবং সর্বশেষ, প্রকৃত হিজড়াদের শুধু কাগজে কলমে স্বীকৃতি না দিয়ে, তাদের বাধ্যতামূলক পুনর্বাসন ও কর্মসংস্থানের আওতায় আনতে হবে, যেন তারা রাস্তায় নেমে মানুষের দিকে হাত বাড়াতে না পারে। অধিকার আদায়ের লড়াই কখনো অন্যের অধিকার খর্ব করে হতে পারে নকি?
মানবিকতার নামে এই বর্বরতাকে প্রশ্রয় দেওয়ার দিন এবার শেষ হওয়া উচিত। প্রশাসনের উদাসীনতা ভেঙে নাগরিক অধিকার ফিরিয়ে দেওয়াই হোক এখনকার প্রধান দাবি।
লেখক
যুক্তরাজ্য প্রবাসী কবি ও লেখক
নীরব চাকলাদার
মন্তব্য করুন: