পুনঃতদন্তের দাবি
সুনামগঞ্জে যাদুকাটা নদী রক্ষা মামলার চার্জশিট নিয়ে বিতর্ক
সুনামগঞ্জের তাহিরপুরে পরিবেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ যাদুকাটা নদীর পাড় কেটে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের ঘটনায় পরিবেশ অধিদপ্তরের দায়ের করা মামলার চূড়ান্ত চার্জশিট (অভিযোগপত্র) নিয়ে তীব্র ক্ষোভ ও গণ-অসন্তুোষ তৈরি হয়েছে। এজাহারভুক্ত মূল অপরাধীদের নাম বাদ পড়া এবং পরিবেশ ধ্বংসের বিরুদ্ধে সোচ্চার আন্দোলনকারীকে নতুন করে আসামি করার ঘটনায় আদালতের দ্বারস্থ হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন ভুক্তভোগীরা।
জানা গেছে, পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ১৯৯৫-এর সংশ্লিষ্ট ধারায় যাদুকাটা নদীর পাড় কাটা ও জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের অভিযোগে গত বছরের ১৫ অক্টোবর তাহিরপুর থানায় একটি মামলা দায়ের করা হয়। পরিবেশ অধিদপ্তর সুনামগঞ্জ কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মোহাইমিনুল হক বাদী হয়ে ৩৭ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতপরিচয় আরও ২০ জনকে আসামি করে মামলাটি দায়ের করেছিলেন। সম্প্রতি মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ও পরিবেশ অধিদপ্তরের জেলা পরিদর্শক সাইফুল ইসলাম সুনামগঞ্জের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে (তাহিরপুর জোন) অভিযোগপত্র দাখিল করেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, তদন্তে প্রকৃত ঘটনা ও মাঠপর্যায়ের সাক্ষ্য-প্রমাণ সম্পূর্ণ উপেক্ষা করা হয়েছে। মামলার এজাহারভুক্ত ১০ জন প্রভাবশালী আসামির নাম চূড়ান্ত চার্জশিট থেকে রহস্যজনকভাবে বাদ দেওয়া হয়েছে। অথচ যাদুকাটা নদী ও পরিবেশ রক্ষায় বালু খেকোদের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে রাজপথে সোচ্চার থাকা আন্দোলনকারী মো. শফিকুল ইসলামকে এই মামলার ৫ নম্বর আসামি করা হয়েছে। এ নিয়ে এলাকায় তীব্র গুঞ্জন ও নিন্দার ঝড় বইছে।
ক্ষোভ প্রকাশ করে শফিকুল ইসলাম বলেন, “আমি সারা জীবন বালু লুটতরাজ আর পাড় কাটার বিরুদ্ধে আন্দোলন করলাম, আজ আমিই নাকি ৫ নম্বর আসামি! বালু লুটের মূল হোতারা তদন্ত কর্মকর্তাকে ম্যানেজ করে চার্জশিট থেকে নিজেদের নাম কাটিয়ে নিয়েছে। এটি সম্পূর্ণ প্রহসন।”
অভিযোগপত্রে নাম আসা তাহিরপুরের লাউড়েরগড়, উত্তর শ্রীপুর, বলারপাড়, বানাগাঁট, পুরানহাটি ও সোনাপুর গ্রামের বাসিন্দারা নিজেদের সম্পূর্ণ নির্দোষ দাবি করেছেন। তাদের অভিযোগ, স্থানীয় একটি প্রভাবশালী মহলের অনৈতিক ইশারায় এবং রাজনৈতিক প্রতিহিংসাবশত মোশাহিদ হোসেন নান্নু, মোশারফ হোসেন কামিল, আখতার উদ্দিন, তোফাজ্জল আহমেদ তামিম, মোস্তফা মিয়া, শাহজাহান, সোহান, কবির মিয়া, তাওহিদ, বিজয় চেয়ারম্যান, আনোয়ার, বেলাল মিয়া, সাবুজ মিয়া, শিমুল, আরিফ, জোহরান মিয়া, জীবন মিয়া, মোজাম্মিল মিয়া, মাহমুদ, জামাল, আহসান মিয়া, রাকাব উদ্দিন, আলী হোসেন এবং শাহীন আলমসহ আরও বেশ কয়েকজনকে রাজনৈতিকভাবে হয়রানি করতে এই মামলায় জড়ানো হয়েছে।
বিতর্কিত এই চার্জশিটের বিষয়ে জানতে চাইলে মামলার বাদী ও পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মোহাইমিনুল হক জানান, তদন্তে যাদের বিরুদ্ধে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে, শুধু তাদের বিরুদ্ধেই অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্টতা না পাওয়ায় অন্যদের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। সুনামগঞ্জ পরিবেশ অধিদপ্তরের অপর এক কর্মকর্তা জানান, বিষয়টি এখন সম্পূর্ণ আদালতের এখতিয়ার। আদালত যে সিদ্ধান্ত দেবেন, সেটিই চূড়ান্ত হবে।
স্থানীয় সুশীল সমাজ ও জনপ্রতিনিধিদের মতে, প্রকৃত অপরাধীদের আড়াল করে নিরপরাধ মানুষকে হয়রানি করা হলে নদী রক্ষা তো দূরের কথা, পরিবেশ আন্দোলনকারীরাও মুখ থুবড়ে পড়বে। অবিলম্বে একটি নিরপেক্ষ ও উচ্চতর তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত অপরাধীদের আইনের আওতার আনার দাবি জানিয়েছেন তারা। এদিকে, এই ‘মনগড়া’ তদন্তের বিরুদ্ধে আইনি লড়াই লড়তে সুনামগঞ্জের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে দ্রুতই পুনঃতদন্তের জন্য নারাজি পিটিশন দাখিলের সর্বাত্মক প্রস্তুতি নিচ্ছেন ভুক্তভোগী পরিবারগুলো।
প্রীতম দাস/ আর আর
মন্তব্য করুন: