অনিশ্চিত প্রাথমিক শিক্ষায় চা শ্রমিকদের সন্তানরা
Led Bottom Ad

শতবর্ষের বঞ্চনা

অনিশ্চিত প্রাথমিক শিক্ষায় চা শ্রমিকদের সন্তানরা

প্রথম সিলেট প্রতিবেদন

১০/০১/২০২৬ ১২:৪৫:৫০

প্রধান উপদেষ্টা পদত্যাগ করবেন না: ফাইজ তাইয়েব আহমেদ

প্রায় একশ বছর ধরে অনিশ্চয়তার মধ্যেই রয়ে গেছে চা শ্রমিকদের সন্তানদের প্রাথমিক শিক্ষা। মফস্বল এলাকার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তুলনায় চা বাগানের বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেশি হলেও নেই শিক্ষার ন্যূনতম পরিবেশ। ফলে প্রাথমিক শিক্ষা থেকেই ঝরে পড়ছে চা বাগানের শিশুরা।

সরেজমিনে দেখা যায়, মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার সীমান্তবর্তী দুর্গম এলাকায় অবস্থিত সুনছড়া (দেবলছড়া) চা বাগানে প্রায় তিন হাজার মানুষের বসবাস। ঘনবসতি এলাকা থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরে টিলার ওপর অবস্থিত সুনছড়া চা বাগান প্রাথমিক বিদ্যালয়। বিদ্যালয় বলতে হেলে পড়া একটি ভাঙা টিনশেড ঘর। গাদাগাদি করে বসে সেখানে ক্লাস করছে চা শ্রমিকদের শিশুরা। অনেক শিক্ষার্থীর পরনে ছেঁড়া জামা, নেই স্কুল ড্রেস কিংবা প্রয়োজনীয় শিক্ষা উপকরণ।

একটি মাত্র ঘরে বাঁশের বেড়া দিয়ে দুইটি শ্রেণিকক্ষ করা হয়েছে। জায়গা সংকুলান না হওয়ায় পাশের হেড ক্লার্কের বাংলোর বারান্দায়ও ক্লাস নিতে হচ্ছে। কয়েকটি ভাঙা বেঞ্চ, একটি ছোট ব্ল্যাকবোর্ড আর কাঠের একটি টুল—এই দিয়েই চলছে পাঠদান। বিদ্যালয়টি ১৯৪০ সালে প্রতিষ্ঠিত হলেও কাগজে প্রতিষ্ঠা সাল দেখানো হয়েছে ১৯৮০।

এই চিত্র শুধু সুনছড়া চা বাগানের নয়। মৌলভীবাজার জেলার ৯২টি চা বাগানের মধ্যে ৬৯টিতে বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। এসব বিদ্যালয়ে প্রায় ৯ হাজার শিক্ষার্থী পড়লেও নেই পর্যাপ্ত শিক্ষক, শ্রেণিকক্ষ, আসবাবপত্র, বিশুদ্ধ পানি কিংবা স্যানিটেশনের ব্যবস্থা। বিদ্যালয় নামমাত্র থাকলেও কার্যকর শিক্ষা কার্যক্রম নেই বললেই চলে।

তথ্য অনুযায়ী, এসব বিদ্যালয়ে গড়ে শিক্ষার্থীর উপস্থিতি ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ। প্রাথমিক স্তরেই ঝরে পড়ে ৩০-৪০ শতাংশ শিক্ষার্থী। মাধ্যমিক পর্যায়ে এসে এই হার বেড়ে দাঁড়ায় ৭০-৮০ শতাংশে। অভাব আর সুযোগ-সুবিধার সংকটে অনেক শিশুই প্রাথমিকের গণ্ডি পেরোতে পারে না।

অভিভাবকদের ভাষ্য, ‘আমরা নিজেরাই কষ্টে দিন কাটাই। সন্তানদের লেখাপড়ার জন্য টাকা খরচ করা আমাদের পক্ষে সম্ভব হয় না। প্রতিটি চা বাগানে সরকারি স্কুল হলে আর উপবৃত্তি চালু হলে অন্তত আমাদের সন্তানরা বাঁচত।’

শিক্ষার্থীরাও জানায়, স্কুলে পড়ার পরিবেশ নেই। ঠিকমতো খাতা-কলম কেনার সামর্থ্য নেই। খেলাধুলার কোনো সুযোগও নেই।

সুনছড়া চা বাগান প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মিটুন কুর্মী বলেন, ‘প্রায় ২০০ শিক্ষার্থীর বিপরীতে শিক্ষক মাত্র তিনজন। আমাদের সম্মানী চা শ্রমিকের মজুরির সমান, অনেক সময় মাসে মাত্র ১ হাজার ২০০ টাকা। তবুও কষ্ট করে শিশুদের পড়াতে হচ্ছে।’

জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. সফিউল আলম বলেন, চা বাগানের বিদ্যালয়গুলো সরকারীকরণ পুরোপুরি সরকারের সদিচ্ছার ওপর নির্ভর করে। চেষ্টা করলে পর্যায়ক্রমে সরকারি করা সম্ভব।

বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের নেতারা দীর্ঘদিন ধরে এই সংকটের কথা বলে আসছেন। ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক নৃপেন পাল বলেন, ‘বারবার স্মারকলিপি দিয়েছি, আন্দোলন করেছি। কিন্তু বাস্তব কোনো অগ্রগতি নেই। চা বাগানের শিশুরা অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ নিয়ে বড় হচ্ছে।’

শিক্ষাবিদদের মতে, চা শ্রমিক জনগোষ্ঠীর জীবনমান বদলাতে হলে শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়নই একমাত্র পথ। শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. আশ্রাফুল করিম বলেন, ১৯৭৭ সালের আইন অনুযায়ী প্রতিটি চা বাগানে একটি করে স্কুল থাকার কথা থাকলেও বাস্তবে তা নেই। এই শতাব্দীপ্রাচীন বৈষম্য দূর করা সরকারের দায়িত্ব।

এ বিষয়ে মৌলভীবাজারের জেলা প্রশাসক তৌহিদুজ্জামান পাভেল বলেন, সুনির্দিষ্ট আবেদন পেলে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে যতটুকু সম্ভব সহযোগিতা করা হবে।

শত বছরের বঞ্চনার এই চক্র ভাঙতে দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ না নিলে চা বাগানের শিশুদের শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হওয়ার ইতিহাস আরও দীর্ঘ হবে—এমনটাই আশঙ্কা স্থানীয়দের।

এ রহমান

মন্তব্য করুন:

Led Bottom Ad
Led Bottom Ad