শীতের তীব্রতায় কাঁপছে শ্রীমঙ্গল, ঝুঁকিতে চা শ্রমিক পরিবারগুলো
ঘন কুয়াশায় ঢাকা চা বাগান, ভেজা পাতার ফাঁক দিয়ে হিমেল হাওয়া। বৃহস্পতিবার (৮ জানুয়ারি) ভোরে শ্রীমঙ্গলে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা নেমে আসে ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। শ্রীমঙ্গল আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, চলতি শীত মৌসুমে এটি এখানকার সর্বনিম্ন তাপমাত্রা।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের হিসাবে, ৬ দশমিক ১ থেকে ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রাকে মাঝারি শৈত্যপ্রবাহ ধরা হয়। সেই হিসেবে শ্রীমঙ্গল বর্তমানে শৈত্যপ্রবাহের কবলে। এর আগে একই তাপমাত্রা দেশের উত্তরাঞ্চলের রাজশাহীতে রেকর্ড হলেও এবার পূর্বাঞ্চলেও শীতের তীব্রতা ছড়িয়ে পড়েছে।
দেশের চা রাজধানী হিসেবে পরিচিত শ্রীমঙ্গল। পর্যটন আর সবুজের আড়ালে এখানে রয়েছে কঠিন বাস্তবতা। উপজেলার প্রায় ৪৭টি চা বাগানে বসবাস করেন হাজার হাজার শ্রমিক পরিবার। সমাজসেবা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, শ্রীমঙ্গলে নিবন্ধিত স্থায়ী ও অস্থায়ী চা শ্রমিকের সংখ্যা ৩২ হাজার ৯৭৭ জন। এর প্রায় ৭৫ শতাংশ নারী। তবে শ্রমিক নেতাদের দাবি, অনিবন্ধিত শ্রমিকসহ প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি।
চা বাগানের শ্রমিক কলোনিগুলো স্থানীয়ভাবে পরিচিত ‘লেবার লাইন’ নামে। ছোট ছোট ঘর, জরাজীর্ণ টিনের ছাউনি আর গাদাগাদি করে বসবাস—এই লেবার লাইনগুলো শীত এলেই সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে।
ভোর হওয়ার আগেই কাজে বের হতে হয় শ্রমিকদের। অনেকের গায়ে নেই পর্যাপ্ত শীতবস্ত্র, পায়ে ছেঁড়া স্যান্ডেল। শিশু ও বয়স্কদের মধ্যে জ্বর, সর্দি ও শ্বাসকষ্টের মতো সমস্যা বাড়ছে।
চা শ্রমিক বিপুল কৈরি বলেন, ‘বাগানের তালিকায় নাম না থাকলে সরকারিভাবে কোনো সহায়তা পাওয়া যায় না। অথচ শীতের কষ্ট সবচেয়ে বেশি আমাদেরই।’
বিভিন্ন গবেষণা অনুযায়ী, শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জ উপজেলার চা বাগানগুলোতে প্রায় ১ লাখ ৭১ হাজার মানুষ বসবাস করেন। শুধু শ্রীমঙ্গলের চা বাগান এলাকাতেই এই সংখ্যা ৯০ হাজার থেকে এক লাখের কাছাকাছি। শ্রমিকদের পাশাপাশি তাঁদের পরিবার—স্ত্রী, সন্তান ও বয়স্ক সদস্যরাও এই লেবার লাইনের বাসিন্দা।
সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় তালিকাভুক্ত চা শ্রমিকরা কিছু সহায়তা পেলেও অনেক প্রকৃত শ্রমিক বঞ্চিত থাকছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। বাগান কর্তৃপক্ষের দেওয়া তালিকার ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় অনিবন্ধিত শ্রমিকেরা সহায়তার বাইরে থেকে যাচ্ছেন।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, জানুয়ারি মাসে আরও কয়েকটি শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এই অবস্থায় শ্রীমঙ্গলের চা বাগান অধ্যুষিত এলাকায় দ্রুত শীতবস্ত্র বিতরণ, স্বাস্থ্যসেবা জোরদার এবং অনিবন্ধিত শ্রমিকদের তালিকাভুক্ত করার দাবি উঠেছে।
সবুজে মোড়া শ্রীমঙ্গল যখন ৭ ডিগ্রির শীতে কাঁপছে, তখন সবচেয়ে বেশি কাঁপছে সেই মানুষগুলো—যাদের শ্রমেই টিকে আছে এই চায়ের শহর।
ডি আর ডি
মন্তব্য করুন: