৫৪ বছরেও কাটেনি বঞ্চনা,ভাঙা স্বপ্নে দিন কাটে বিয়ানীবাজারবাসীর
স্বাধীনতার ৫৪ বছর পরও সিলেটের প্রবাসী অধ্যুষিত বিয়ানীবাজার যেন উন্নয়ন থেকে বিচ্ছিন্ন এক জনপদ। তিন লাখ মানুষের এই উপজেলার প্রতিটি প্রান্তে আজও লুকিয়ে আছে অবকাঠামো সংকট, নাগরিক সেবার সীমাবদ্ধতা আর দীর্ঘদিনের অবহেলার দুঃখ।
ভোট আসে, ভোট যায়—প্রতিশ্রুতির বন্যায় ভেসে যায় এলাকা। নির্বাচনের সময়ে মানুষ আশার আলো দেখেন—সড়ক হবে, সেতু হবে, চিকিৎসা-শিক্ষা সেবা উন্নত হবে। কিন্তু ভোটের পর বিয়ানীবাজারবাসী ফিরে যায় সেই পুরোনো বাস্তবতায়। মানুষের ভাষায়, ‘ভোট দিই আমরা, উন্নয়ন পায় অন্য কেউ।’
রাজনৈতিকভাবে সচেতন জনপদ হলেও এখানে বাস্তব চিত্র ভিন্ন। সড়ক–সংযোগহীনতা, স্বাস্থ্যসেবার সীমাবদ্ধতা, কর্মসংস্থান না থাকা, পৌরসেবা দুর্বল, শিক্ষাখাত অনগ্রসর—সব মিলিয়ে বিয়ানীবাজার যেন উপেক্ষার এক দীর্ঘচিত্র। বিয়ানীবাজার–গোলাপগঞ্জ আসন থেকে জাতীয় পর্যায়ে নেতা, উপদেষ্টা, সচিব হয়েছেন অনেকেই; কিন্তু এলাকার ভাগ্য ফেরেনি।
ঝুঁকিপূর্ণ শেওলা সেতু, নদীভাঙনে হুমকির মুখে থাকা চন্দরপুর সেতুর সংযোগ সড়ক, অনিশ্চিত শিকপুর–বহরগ্রাম সেতু—এসবের কারণে প্রতিদিন আতঙ্কে কাটে হাজারো মানুষের জীবন। কদমতলী–শেওলা ফোরলেন সড়কের কাজও অনিশ্চয়তায়। সরকারি খেলার মাঠ নেই, কলেজ ভবন তৈরির কাজ বন্ধ।
মুড়িয়া হাওরপাড়ের মানুষ বছরের পর বছর ধরে জীবনযুদ্ধে লড়ছেন যোগাযোগ আর নিরাপত্তাহীনতার সঙ্গে। হাওর অঞ্চলের নদীভাঙন, সড়ক বিচ্ছিন্নতা, হাসপাতালের সংকট—সব মিলিয়ে মানুষের কষ্ট যেন চিরস্থায়ী রূপ নিয়েছে।
সাবেক প্রধান শিক্ষক জিয়া উদ্দিন আহম্মদ ক্ষোভ নিয়ে বলেন, “বিয়ানীবাজারের রাজনীতি যেন একই নাটকের নতুন মঞ্চায়ন—চরিত্র বদলায়, সংলাপ বদলায় না। জনগণই শুধু পাশে দাঁড়িয়ে তালি দেয়, কিন্তু তাদের জীবনে বদলায় না কিছুই।”
উপজেলার ১০টি ইউনিয়নের কোনো সড়কই সুস্থভাবে চলাচলের উপযোগী নয়। গ্রামীণ সড়ক ভাঙাচোরা, বর্ষায় কাদা–জল মিলেমিশে একাকার। পৌরসভা প্রতিষ্ঠার ২৫ বছরেও নেই ডাম্পিং সাইট, নেই সুষ্ঠু ড্রেনেজ। সামান্য বৃষ্টিতে হাঁটা দায়। পৌর এলাকার বাসিন্দা সেলিনা বেগম আক্ষেপ করে বলেন, “বৃষ্টি হলেই বাড়ির বাইরে বের হতে ভয় লাগে। কত বছর ধরে পৌরসভায় থাকি, উন্নয়নটা দেখি না।”
স্বাস্থ্যসেবার অবস্থা আরও হতাশাজনক। ৫০ শয্যার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেই পর্যাপ্ত চিকিৎসক, নেই প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি। জরুরি রোগীদের সিলেটেই পাঠাতে হয়। মুড়িয়া ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান আবুল খায়ের বলেন, “হাসপাতাল আছে, কিন্তু চিকিৎসা নেই।”
গর্ব করার মতো কোনো উচ্চমানের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নেই, নেই বিশ্ববিদ্যালয়। গ্যাস উত্তোলন হলেও জনগণ সেই গ্যাস সুবিধা পায় না; শিল্প–কারখানা হয়নি, কর্মসংস্থান তৈরি হয়নি। অথচ ব্যাংকগুলোতে পড়ে আছে কোটি কোটি টাকা—বিনিয়োগ নেই, উদ্যোগ নেই।
হাসপাতালে রোগী নিয়ে আসা আমিনা বেগম বলেন, “জরুরি সেবার জন্যও আমাদের সিলেটে যেতে হয়। এত দিনের স্বাধীন দেশে এমন কষ্ট কেন?”
বিয়ানীবাজারবাসীর দীর্ঘদিনের আক্ষেপ—স্বাধীনতার ৫৪ বছর পরও আমাদের ভাগ্যে কি শুধু অবহলাই লেখা থাকবে?
ডি আর ডি
মন্তব্য করুন: