ধারণক্ষমতার বাইরে পর্যটক: অস্তিত্ব সংকটে লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান
মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জে অবস্থিত ১২৫০ হেক্টরের সংরক্ষিত লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান এখন পর্যটকদের অনিয়ন্ত্রিত চাপে পিষ্ট। পবিত্র ঈদুল ফিতরের ছুটিতে বনের ধারণক্ষমতার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি পর্যটক প্রবেশ করায় বনের স্বাভাবিক পরিবেশ ও বন্যপ্রাণীদের আবাসস্থল চরম হুমকির মুখে পড়েছে। প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ টিকিট ছাড়াই বনের উন্মুক্ত চারপাশ দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করছেন, যা নিয়ন্ত্রণে হিমশিম খাচ্ছে বন বিভাগ। বনের ভেতর দিয়ে যাওয়া রেললাইনে চলন্ত ট্রেনের সঙ্গে সেলফি তোলার হিড়িক এবং যত্রতত্র প্লাস্টিক বর্জ্য ফেলার কারণে বনটি এখন এক বিশৃঙ্খল ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে।
বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের তথ্যমতে, ঈদের ছুটিতে মাত্র চার দিনে প্রায় ৬ হাজার পর্যটক টিকিট কেটে প্রবেশ করলেও বাস্তবে ৯৫ শতাংশ পর্যটকই টিকিট ছাড়া বনের ভেতরে ঢুকে পড়েছেন। পর্যটকদের চিৎকার, উচ্চশব্দ এবং চিপস-চকলেটের প্যাকেট ও প্লাস্টিক বোতল ফেলার কারণে বনের ৪৬০ প্রজাতির দুর্লভ উদ্ভিদ ও প্রাণীর জীবনচক্র ব্যাহত হচ্ছে। বিশেষ করে শ্রীমঙ্গল-ভানুগাছ সড়কে তীব্র যানজট এবং ভিআইপিদের গাড়ি নিয়ে সরাসরি বনের ভেতরে প্রবেশের সংস্কৃতি বনের নিস্তব্ধতা ভেঙে দিচ্ছে। নরসিংদী থেকে আসা পর্যটক মার্জান আহমেদ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "বন্যপ্রাণী দেখতে এসে কেবল মানুষের ভিড় আর গাছের দেখা মিলল; পর্যটক নিয়ন্ত্রণ না করলে এই বনের অস্তিত্ব থাকবে না।"
পরিবেশবাদীরা সতর্ক করে বলেছেন, লাউয়াছড়া বনের প্রাকৃতিক পরিবেশ গত কয়েক বছর ধরে ক্রমাগত ক্ষত-বিক্ষত হচ্ছে। বনের ঘনত্ব কমে যাওয়া এবং সড়ক ও রেলপথে যানবাহনের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে প্রাণীরা আতঙ্কিত হয়ে এলাকা ছাড়ছে।
সিলেট বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. আবুল কালাম জানান, অতিরিক্ত জনসংখ্যার চাপে পর্যটকরা প্রাকৃতিক পরিবেশে এসে বেসামাল হয়ে পড়েন।
তিনি বলেন, "চলন্ত ট্রেনের সঙ্গে সেলফি তোলার মতো ঝুঁকিপূর্ণ কাজ বিশ্বের কোথাও দেখা যায় না, যা এখানে নিয়মিত ঘটছে। আমাদের জনবল সংকট থাকলেও পরিবেশ রক্ষায় আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।"
শক্ত আইনি পদক্ষেপ এবং পর্যটকদের প্রবেশাধিকার সীমিত করা না হলে লাউয়াছড়া অচিরেই তার চিরসবুজ বৈশিষ্ট্য হারাবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
এ রহমান
মন্তব্য করুন: