ভারপ্রাপ্তেই বন্দি দিরাই সরকারি কলেজ: ধ্বংসের মুখে শিক্ষাব্যবস্থা

ভারপ্রাপ্তেই বন্দি দিরাই সরকারি কলেজ: ধ্বংসের মুখে শিক্ষাব্যবস্থা

পূজা বাড়াইক

২০/০৯/২০২৬ ১৫:১৭:০৪

প্রধান উপদেষ্টা পদত্যাগ করবেন না: ফাইজ তাইয়েব আহমেদ

শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মূল চালিকাশক্তি হলেন একজন স্থায়ী অধ্যক্ষ। প্রশাসনিক দূরদর্শিতা ও অভিজ্ঞতার অভাবে অধ্যক্ষহীন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান একসময় দিকনির্দেশনাহীন নৌকার মতো পথ হারায়। এর চরম বাস্তব প্রতিচ্ছবি সুনামগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী দিরাই সরকারি ডিগ্রি কলেজ। দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে স্থায়ী অধ্যক্ষ না থাকায় ভেঙে পড়েছে কলেজটির প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ও সার্বিক শিক্ষা পরিবেশ। ফলে ভাটি অঞ্চলের হাজারো শিক্ষার্থীর স্বপ্নের এই বিদ্যাপীঠের শিক্ষাব্যবস্থা এখন চরম বিপর্যস্ত ও ধ্বংসের মুখে।


কলেজ প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, ১৯৭৯ সালে শিক্ষার আলো ছড়াতে যাত্রা শুরু করেছিল দিরাই সরকারি ডিগ্রি কলেজ। দেখতে দেখতে দীর্ঘ ৪৭ বছর অতিবাহিত হলেও আজও এখানে চালু হয়নি অনার্স (স্নাতক সম্মান) কোর্স। অথচ প্রতিষ্ঠানটির প্রধান সংকটের শুরু ২০০৯ সালে। কলেজের প্রতিষ্ঠাকালীন অধ্যক্ষ আব্দুল হান্নান চৌধুরী ২০০৯ সালে অবসরে যাওয়ার পর থেকেই শুরু হয় ভারপ্রাপ্তের রাজত্ব। এরপর একে একে উপাধ্যক্ষ মিহির রঞ্জন দাস, অনুকূল চন্দ্র দেব, বিমান চৌধুরী, ধীমান কীর্তনিয়া, প্রদীপ রঞ্জন দাস, ফখর উদ্দিন চৌধুরী এবং বর্তমানে রফিকুল ইসলাম ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের চেয়ারে বসে জোড়াতালি দিয়ে কলেজটি চালিয়ে নিচ্ছেন। মাঝখানে দেড় বছর আগে সরকার এক স্থায়ী অধ্যক্ষকে নিয়োগ দিলেও তিনি মাত্র তিন মাস দায়িত্ব পালন করেই অন্যত্র বদলি হয়ে যান। ফলে ১৭ বছরের দীর্ঘ পথচলায় কার্যত ‘অভিভাবকহীন’ অবস্থাতেই ধুঁকছে বিশাল এই সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি।


স্থায়ী নেতৃত্বের অভাবে কলেজের সর্বত্র নেমে এসেছে চরম স্থবিরতা। একসময় যে ক্যাম্পাস শিক্ষার্থীদের পদচারণায় মুখরিত থাকত, সেখানে এখন শ্মশানের নীরবতা। শিক্ষার্থী থাকলেও নিয়মিত ক্লাসের দেখা নেই, ফলে কলেজ ক্যাম্পাস ছেড়ে তারা ঝুঁকে পড়ছে বাণিজ্যিক কোচিং সেন্টারগুলোর দিকে।


ক্ষোভ প্রকাশ করে কলেজের সাবেক এক শিক্ষার্থী বলেন, “আমাদের আমলে আধুনিক বহুতল ভবন বা এতো চমৎকার মনোরম পরিবেশ ছিল না; কিন্তু শিক্ষার পরিবেশ ছিল দুর্দান্ত। আমরা নিয়মিত ক্লাস করতাম, সাহিত্য-সংস্কৃতির চর্চা হতো, উৎসবমুখর পরিবেশে ৪ বার ছাত্র সংসদ নির্বাচন হয়েছে। আর আজ জাকজমকপূর্ণ বিল্ডিং ও সুন্দর পরিবেশ থাকলেও নেই শুধু শিক্ষার প্রাণ এবং শিক্ষার্থীদের কোলাহল। আমাদের সন্তানরা এখন কলেজবিমুখ হয়ে কোচিংমুখী হচ্ছে। যদি এখনই শিক্ষক ও অভিভাবকরা যৌথ উদ্যোগ না নেন, তবে দিরাইয়ের শিক্ষার ভবিষ্যৎ চিরতরে অন্ধাকারে হারিয়ে যাবে।”


অনুসন্ধানে জানা যায়, অধ্যক্ষ সংকটের পাশাপাশি কলেজটিতে দেখা দিয়েছে চরম শিক্ষক ঘাটতি। মাত্র ৫ জন স্থায়ী শিক্ষক দিয়ে চলছে হাজারও শিক্ষার্থীর পাঠদান কার্যক্রম। তাদের সহায়তায় ১০ জন খণ্ডকালীন (পার্ট-টাইম) শিক্ষক রাখা হলেও তা চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল। শ্রেণিকক্ষে পাঠদান ব্যাহত হওয়ায় শিক্ষার্থীদের ক্লাসে ধরে রাখা সম্ভব হচ্ছে না।


এ বিষয়ে কলেজের বর্তমান ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ রফিকুল ইসলাম বিষাদগ্রস্ত কণ্ঠে বলেন, “২০০৯ সাল থেকে আজ পর্যন্ত স্থায়ী অধ্যক্ষ ছাড়াই জোড়াতালি দিয়ে প্রতিষ্ঠান চলছে। শিক্ষক সংকট এখন চরম আকার ধারণ করেছে। বর্তমানে আমরা মাত্র ৫ জন স্থায়ী শিক্ষক আছি, বাধ্য হয়ে ১০ জন খণ্ডকালীন শিক্ষক দিয়ে পাঠদান চালিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছি। অধ্যক্ষ নিয়োগ ও শিক্ষক স্বল্পতার বিষয়ে বারবার উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে লিখিতভাবে জানিয়েও আজ পর্যন্ত কোনো সুফল পাইনি। তবে সম্প্রতি বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় সংসদ সদস্যের সাথে বিস্তারিত আলোচনা করেছি। আশা করছি, কর্তৃপক্ষ এবার ভাটি অঞ্চলের এই প্রধান বিদ্যাপীঠের দিকে নজর দেবে।”


কংক্রিটের বড় বড় দালানকোঠা আর সুন্দর বাগান কখনো কোনো কলেজের শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করতে পারে না। অভিভাবকহীন একটি প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকরা দিশেহারা, শিক্ষার্থীরা বিমুখ এবং প্রশাসনিক শৃঙ্খলা বিলুপ্ত। সচেতন মহলের মতে, অতি দ্রুত দিরাই সরকারি ডিগ্রি কলেজে স্থায়ী অধ্যক্ষ ও প্রয়োজনীয় শিক্ষক নিয়োগ না দিলে ভাটি অঞ্চলের শিক্ষা ব্যবস্থা পুরোপুরি ধসে পড়বে। সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগের কাছে দিরাইবাসীর জোর দাবি—অবিলম্বে দিরাই সরকারি ডিগ্রি কলেজকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করা হোক।

নীরব চাকলাদার/ প্রসি-২০২৬

মন্তব্য করুন:

Led Bottom Ad
Led Bottom Ad