কারো স্বামী নেই, কারো ঘরে অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী
Led Bottom Ad

সিলেটে দুর্ঘটনায় ঝরল ৮ শ্রমিকের প্রাণ

কারো স্বামী নেই, কারো ঘরে অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী

প্রথম সিলেট প্রতিবেদন

০৩/০৫/২০২৬ ২৩:০৫:১১

প্রধান উপদেষ্টা পদত্যাগ করবেন না: ফাইজ তাইয়েব আহমেদ

সিলেট-ঢাকা মহাসড়কের দক্ষিণ সুরমায় আবারও রক্ত ঝরল নির্মাণ শ্রমিকদের। রবিবার (৩ মে) ভোরে তেলিবাজার এলাকায় ট্রাক ও শ্রমিকবাহী পিকআপ ভ্যানের মুখোমুখি সংঘর্ষে ২ নারীসহ অন্তত ৮ জন নিহত হয়েছেন। ২০২৩ সালের জুনে নাজিরবাজারে ১৫ শ্রমিকের প্রাণহানির ক্ষত শুকানোর আগেই প্রায় একই কায়দায় এবারও পিষ্ট হলেন একদল কর্মজীবী মানুষ। আম্বরখানা থেকে ঢালাইয়ের কাজ করতে যাওয়ার পথে এক ঘাতক ট্রাকের বেপরোয়া গতি আর চালকের সম্ভাব্য তন্দ্রাচ্ছন্নতা কেড়ে নিল ৮টি প্রাণ, আর ১০ জন এখন হাসপাতালের শয্যায় যন্ত্রণায় কাতর।

ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গের সামনে স্বজনদের আহাজারিতে আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে। নিস্তব্ধ দুপুরে সেই মর্গের বারান্দায় কথা হয় নিহত মুন্নী বেগমের ভাই হুমায়ুন আহমদের সঙ্গে। তিনি শোনালেন এক করুণ জীবনযুদ্ধ শেষ হওয়ার গল্প। “আমার বোনই ছিল তিন সন্তানের একমাত্র ভরসা,” বলতে বলতে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। মুন্নীর স্বামী চার বছর ধরে নিখোঁজ। অভাবের তাড়নায় ঢালাই শ্রমিকের কাজ বেছে নিয়েছিলেন তিনি। ভোরে না খেয়েই কাজে বেরিয়েছিলেন তিন সন্তানের মুখে অন্ন জোগাতে, কিন্তু সেই খাবার আর জোটা হলো না। মুন্নীর মৃত্যুতে তার তিনটি অবুঝ শিশু এখন দিশেহারা।

একই হাসপাতালের ক্যাজুয়ালটি বিভাগে চিকিৎসাধীন হাফিজা বেগমের (৩০) গল্পটি আরও বিয়োগান্তক। তিনি ও তার স্বামী বদরুল আমিন একসঙ্গে কাজ করতেন। দুর্ঘটনার সময় স্বামী বদরুল নিজের জীবনের মায়া ত্যাগ করে স্ত্রীকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিলেও নিজে বাঁচতে পারেননি। ভারী মিকশ্চার মেশিনটি গায়ের ওপর পড়ে পিষ্ট হন বদরুল। হাফিজা হাসপাতালের এক কক্ষে যন্ত্রণার সঙ্গে লড়ছেন, আর অন্য কক্ষের মর্গে পড়ে আছে তার স্বামীর নিথর দেহ। তাদের চার সন্তান এখনো জানে না, মা বেঁচে ফিরলেও বাবা আর কোনোদিন তাদের মাথায় হাত বুলিয়ে দেবেন না।

দুর্ঘটনার শিকার অন্য পরিবারগুলোর চিত্রও একই রকম। দিরাইয়ের ফরিদুল ইসলামের স্ত্রী ছয় মাসের অন্তঃসত্ত্বা। অনাগত সন্তানের মুখ দেখার আগেই চিরবিদায় নিলেন তিনি। অন্যদিকে, নিহত পাণ্ডব বিশ্বাস পরিবারের সঙ্গে অভিমান করে মাত্র আট দিন আগে কাজের সন্ধানে সিলেট এসেছিলেন, আজ ফিরছেন নিথর দেহ হয়ে। নিহতের তালিকায় রয়েছেন বিশ্বম্ভরপুরের দুই ভাই আজির উদ্দিন ও আমির উদ্দিনও।

ভোরবেলা প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা এসএসএফ (SSF) প্রটোকলে থাকা পুলিশ সদস্য রণজিৎ তালুকদার এই নির্মম ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী। তিনি জানান, ঘাতক ট্রাকটি সম্ভবত চালক নয়, বরং ঘুম চোখে হেল্পার চালাচ্ছিল। তিনি বলেন, “পাখির বাচ্চার মতো মানুষগুলো গাড়ি থেকে ছিটকে পড়ল, চোখের সামনে সব শেষ হয়ে গেল।” ফায়ার সার্ভিস ও পুলিশের প্রাথমিক ধারণা, ট্রাকচালকের ক্লান্তি বা ঘুমই এই দুর্ঘটনার মূল কারণ।

সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত উপকমিশনার (মিডিয়া) মো. মঞ্জুরুল আলম জানিয়েছেন, ঘাতক ট্রাক ও পিকআপ জব্দ করা হয়েছে এবং ট্রাকের হেল্পারকে হেফাজতে নেওয়া হয়েছে।

বর্তমানে মর্মান্তিক এই ঘটনায় আইনি প্রক্রিয়া চলমান থাকলেও তেলিবাজার ও নাজিরবাজারের মতো মৃত্যুফাঁদগুলোতে বারবার শ্রমজীবী মানুষের প্রাণহানি প্রশাসনের নজরদারি নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। যান্ত্রিক এই শহরে দিনশেষে কিছু অবুঝ শিশুর প্রশ্ন রয়ে যায়—কাজে যাওয়া বাবা-মায়েরা কেন আর ঘরে ফেরে না?


এ রহমান

মন্তব্য করুন:

Led Bottom Ad
Led Bottom Ad