সিলেটের তেলিবাজারে সড়ক দুর্ঘটনা
‘পাখির বাচ্চার মতো ছিটকে পড়ল মানুষগুলো’
“তেলিবাজার মারকাজ পয়েন্টে আসতেই হঠাৎ চোখের সামনে দেখলাম ভয়াবহ এক দৃশ্য। কাঁঠালবোঝাই একটি ট্রাক সজোরে ধাক্কা দিল শ্রমিকবাহী পিকআপটির পেছনে। মুহূর্তের মধ্যে পাখির বাচ্চার মতো ৮-৯ জন মানুষ পিকআপ থেকে ছিটকে রাস্তায় আছড়ে পড়লেন। তাদের আর্তচিৎকারে আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে ওঠে।” সিলেট-ঢাকা মহাসড়কের দক্ষিণ সুরমায় রবিবারের সেই মর্মান্তিক দুর্ঘটনার বর্ণনা দিচ্ছিলেন প্রত্যক্ষদর্শী পুলিশ সদস্য রনজিৎ তালুকদার।
ভোরবেলা যখন চারপাশ কুয়াশা আর নিস্তব্ধতায় ঢাকা, তখন রনজিৎ তালুকদার প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা এসএসএফ (SSF) সদস্যদের প্রটোকল ডিউটিতে ছিলেন। সরকারি দায়িত্ব পালনের পথে তার চোখের সামনেই ঘটে যায় এই প্রাণহানি। রনজিৎ তালুকদার জানান, দুর্ঘটনার ধরন দেখে তার মনে হয়েছে ট্রাকটি কোনো দক্ষ চালক নয়, বরং হেল্পার চালাচ্ছিল। তিনি বলেন, “আটক করার পর ওই ব্যক্তির চোখ দেখে মনে হয়েছে সে প্রচণ্ড ঘুমকাতর ছিল।” দুর্ঘটনার পরপরই রনজিৎ দ্রুত গাড়ি থামিয়ে ৯৯৯-এ কল দিয়ে দক্ষিণ সুরমা থানা পুলিশকে খবর দেন।
রবিবার (৩ মে) ভোর ৬টা ২৫ মিনিটের এই ভয়াবহ সংঘর্ষে এখন পর্যন্ত ৮ জন নির্মাণ শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। তারা সবাই জীবিকার তাগিদে নগরের আম্বরখানা থেকে পিকআপে করে লালাবাজারের দিকে যাচ্ছিলেন। নিহতদের মধ্যে সুনামগঞ্জের বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার দুই ভাই আজির উদ্দিন ও আমির উদ্দিন যেমন রয়েছেন, তেমনি রয়েছেন ধর্মপাশার নার্গিস ও দিরাইয়ের মুন্নি মনির মতো নারী শ্রমিকরাও। এছাড়া সিলেটের কোম্পানীগঞ্জের পান্ডব বিশ্বাস ও বদরুল জামানসহ আরও কয়েকজনের পরিচয় নিশ্চিত করেছে পুলিশ।
শ্রমিকদের সহকর্মীরা জানান, ঢালাইয়ের কাজের জন্য পিকআপটিতে প্রায় ১৫ জন আরোহী ছিলেন। সংঘর্ষের তীব্রতা এতটাই বেশি ছিল যে, ৪ জন শ্রমিক ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান এবং বাকি ৪ জন হাসপাতালে নেওয়ার পর নিথর হয়ে যান। বর্তমানে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৬ জন শ্রমিক মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছেন।
সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের এডিসি (মিডিয়া) মনজুরুল আলম ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, দুর্ঘটনার পর ট্রাক ও পিকআপের দুই চালক পালিয়ে গেলেও ঘাতক ট্রাকের হেল্পারকে আটক করা হয়েছে।
ভোরবেলার সেই রাজপথ যেখানে শ্রমজীবী মানুষের পদচারণায় মুখর হওয়ার কথা ছিল, এক অসতর্ক চালকের ঘুম জড়ানো চোখের কারণে তা এখন বিষাদপুরীতে পরিণত হয়েছে। মৃতদেহগুলোর পাশে স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে আছে ওসমানী হাসপাতালের মর্গ এলাকা।
এ রহমান
মন্তব্য করুন: