যাদুকাটায় রাতের আঁধারে ড্রেজার তাণ্ডব: নিষেধাজ্ঞা মানছেনা বালু খেকোরা
সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার যাদুকাটা নদীতে বালু উত্তোলনকে কেন্দ্র করে অনিয়ম ও চাঁদাবাজির অভিযোগ যেন থামছেই না। হাওরে বোরো ধান কাটার শ্রমিক সংকট নিরসনে স্থানীয় সংসদ সদস্য ও জেলা প্রশাসন যাদুকাটায় বালু উত্তোলন সাময়িকভাবে বন্ধের ঘোষণা দিলেও তা মানছে না প্রভাবশালী চক্র। দিনে বন্ধ থাকার নাটক চললেও রাত নামলেই শতাধিক ড্রেজার মেশিনে চলছে নদী পাড় কাটার মহোৎসব। এতে পরিবেশের পাশাপাশি স্থানীয় জনজীবন ও নদী তীরের প্রতিরক্ষা বাঁধ হুমকির মুখে পড়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, রাতে একেকটি ড্রেজার থেকে ৩০ হাজার টাকা করে চাঁদা আদায় করছে একটি প্রভাবশালী মহল। এই চক্রের আস্ফালনে প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞা কেবল কাগজ-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকছে। অভিযোগের তীর উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক জুনাব আলীর দিকে থাকলেও তিনি তা অস্বীকার করে বলেন, ‘আমি ইজারাদার নই। যারা ধান কাটতে বাধা দিচ্ছে বা পাড় কাটছে, তাদের বিরুদ্ধে আমাদের অবস্থান কঠোর।’ এদিকে, নদীর পাড় কাটা বন্ধ ও ধান কাটার মৌসুমে বালু উত্তোলন বন্ধ রাখতে টহল জোরদারের জন্য নৌযানের জ্বালানি ব্যয় বাবদ গত শনিবার এক লাখ টাকা অনুদান দিয়েছেন স্থানীয় সংসদ সদস্য কামরুজ্জামান কামরুল।
অনুসন্ধানে জানা যায়, মিয়ারচর গ্রামের ইকরাম ও সুমন মিয়াসহ একটি চক্র রাতের আঁধারে টাকা উত্তোলনের সঙ্গে জড়িত। পরিচয় গোপন রাখার শর্তে এক বাসিন্দা জানান, রাত হলেই নদীতে অন্তত একশ ড্রেজার সচল হয়। টাকা না দিলে কাজ করা সম্ভব হয় না। বিশ্বম্ভরপুর উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য আব্দুল আওয়াল জানান, গত কয়েকদিন ধরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লেখালেখি হওয়ায় ড্রেজারের সংখ্যা কিছুটা কমলেও চাঁদাবাজি বন্ধ হয়নি। রাজনৈতিক নেতা, কতিপয় সাংবাদিক ও অসাধু পুলিশ সদস্যদের নাম ভাঙিয়ে একটি চক্র নিয়মিত চাঁদা তুলছে।
যাদুকাটা নদীর ইজারা নিয়ে চলছে আইনি জটিলতা। উচ্চ আদালতের নির্দেশে ইজারার মেয়াদ আগামী ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে বলে দাবি করেছেন ইজারাদার ও দক্ষিণ বড়দল ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক নাছির মিয়া। তবে তিনি বলেন, ‘ধান কাটার শ্রমিক সংকটের কারণে ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত আমরা স্বেচ্ছায় কাজ বন্ধ রেখেছি। রাতে যারা ড্রেজার চালাচ্ছে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে আমরা প্রশাসনকে বলেছি।’
পরিবেশবিদদের মতে, যাদুকাটায় এখন আর বালু নেই, ড্রেজার দিয়ে মূলত নদীর পাড় কাটা হচ্ছে। সুনামগঞ্জ পরিবেশ আন্দোলনের সভাপতি একেএম আবু নাসার বলেন, ‘দিনে-রাতে পাড় কাটার ফলে নদীগর্ভে জনপদ বিলীন হচ্ছে। দ্রুত আইনি ব্যবস্থা না নিলে নদীর স্বাভাবিক গতিপথ ধ্বংস হয়ে যাবে।’
তাহিরপুর থানার ওসি মো. আমিনুল ইসলাম রাতে ড্রেজার চলার খবর অস্বীকার করলেও জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মিনহাজুর রহমান জানান, বিষয়টি শোনার পর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে (ইউএনও) কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এরপরেও নির্দেশ অমান্য করা হলে বড় ধরনের অভিযান চালানো হবে। অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) সমর কুমার পাল জানিয়েছেন, ইজারার মেয়াদ বৃদ্ধির আদেশের বিরুদ্ধে প্রশাসন উচ্চ আদালতে আপিল করেছে, যা বর্তমানে শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে।
এ রহমান
মন্তব্য করুন: