মাধবকুণ্ড জলপ্রপাত : প্রজাপতির রঙে সাজানো স্বর্গভূমি হুমকিতে
রঙিন ডানার নৃত্যে মুগ্ধ করা প্রজাপতির আবাসভূমি হিসেবে দীর্ঘদিন ধরেই পরিচিত মৌলভীবাজারের বড়লেখার মাধবকুণ্ড ইকোপার্ক। দেশের মোট ৪২১ প্রজাতির প্রজাপতির মধ্যে এখানেই দেখা মেলে প্রায় ২০০ প্রজাতি—যা বাংলাদেশের প্রজাপতি বৈচিত্র্যের প্রায় অর্ধেক। গবেষকরা বলছেন, দেশের আর কোথাও এতো প্রজাতির প্রজাপতি একসঙ্গে দেখা যায় না।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মনোয়ার হোসেনের ২০২৩ সালের জরিপেও মাধবকুণ্ডকে প্রজাপতির অন্যতম সমৃদ্ধ অঞ্চল হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ব্যক্তিগত উদ্যোগে ছবি সংগ্রহকারী গবেষকদের হিসাবেও মাধবকুণ্ডে প্রায় ১৬০–২০০ প্রজাতির প্রজাপতির উপস্থিতি পাওয়া গেছে। গত দুই বছরে এখান থেকে দেশের জন্য নতুন দুটি প্রজাতিরও সন্ধান মিলেছে— Pithauria marsena (Banded Straw Ace) – ২০২৩, Celaenorrhinus nigricans (Small Banded Flat) – ২০২৫।
বিশেষজ্ঞরা জানান, উদ্ভিদের বৈচিত্র্য ও মিঠাপানির স্থায়ী প্রবাহ প্রজাপতির জন্য মাধবকুণ্ডকে স্বর্গভূমি বানিয়েছে। ২০২২ সালের উদ্ভিদ জরিপে দেখা যায়, এখানে রয়েছে ২১৭ প্রজাতির গুরুত্বপূর্ণ হোস্ট উদ্ভিদ, যা প্রজাপতির জীবনচক্র বজায় রাখতে অপরিহার্য। পাশাপাশি ঝর্ণার পানি বেয়ে তৈরি হওয়া আর্দ্র স্থানগুলোতে প্রজাপতির ‘Puddling’ আচরণের জন্য আদর্শ পরিবেশ তৈরি হয়।
তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এ স্বর্গভূমি হুমকির মুখে পড়ছে। পর্যটন অবকাঠামো নির্মাণ, উদ্ভিদ ধ্বংস, বালুচর কমে যাওয়া, এবং অনিয়ন্ত্রিত ভ্রমণচাপের কারণে প্রজাপতির সংখ্যা দৃশ্যমানভাবে কমে যাচ্ছে বলে জানান গবেষকরা। ২০২৩ সালের তুলনায় ২০২৫–এ পরিস্থিতি আরও খারাপ—বলা হচ্ছে, কিছু প্রজাতি আগের মতো নিয়মিত দেখা যাচ্ছে না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রজাপতি হারিয়ে গেলে শুধু একটি প্রাণী নয়, নষ্ট হবে পুরো পরিবেশের ভারসাম্য। কারণ তারা পরাগায়ন, খাদ্যজাল এবং পরিবেশগত পরিবর্তনের সূচক হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ।
তাদের পরামর্শ— সংবেদনশীল এলাকায় নির্মাণ কার্যক্রম সীমিত রাখা, হোস্ট উদ্ভিদের সংরক্ষণ, ঝর্ণার স্বাভাবিক প্রবাহ অক্ষুণ্ন রাখা, জীববৈচিত্র্য পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা চালু করা, স্থানীয়দের সচেতনতা বৃদ্ধি।
অন্যথায়, মাধবকুণ্ডের রঙিন ডানার স্বর্গরাজ্য একদিন হারিয়ে যেতে পারে—যা দেশের জীববৈচিত্র্যের জন্য বড় ধরনের ক্ষতি বলে মনে করছেন পরিবেশবিদরা।
এ রহমান
মন্তব্য করুন: