সুহেলের তান্ডব যজ্ঞ
ক্রমেই অশান্ত হয়ে উঠছে সিলেটের ওসমানীনগর
পান থেকে চুন কষলেই ছড়িয়ে পরে উত্তেজনা। উত্তেজনা রূপ নেয় গুলাগুলিতে। তারপর একের পর এক মামলা। মামলায় হয়রানীর শিকার হন শান্তিপ্রিয় লোকজন। এতে করে শান্ত, স্নিগ্ধ ও মনোরম পরিবেশের এই গ্রামটি ক্রমেই অশান্ত হয়ে উঠেছে। গ্রামটির নাম খাদিমপুর। সিলেটের ওসমানীনগর উপজেলার উমরপুর ইউনিয়নে গ্রামটির অবস্থান। বছরজুড়ে কোনো না কোন ঘটনায় সংবাদ শিরোনাম হয় গ্রামটি। তবে গ্রামবাসীরা বলছেন, সবঘটনার অন্তরালে ক্ষমতার দাপট। এই দাপটের পেছনে রয়েছে অঢেল টাকা-পয়সার বিনিয়োগ। যে কারণে দখলবাণিজ্য, সংঘর্ষ,একে অন্যকে ঘায়েল করা এই গ্রামে এখন নিত্য নৈমিত্তিক ব্যাপার। তবে গ্রামবাসীর অভিযোগের তীর এক যুক্তরাজ্য প্রবাসীর প্রতি। ঘটনার শিকার হওয়া গ্রামবাসীর পক্ষ থেকে বিস্তারিত তোলে ধরে একটি অভিযোগ দাখিল করা হয়েছে সিলেটের পুলিশ সুপার বরাবরে। অভিযোগকারীর নাম কামাল হোসেন।
যেভাবে ঘটনার সূত্রপাত
চলতি বছরের ৩০ এপ্রিল খাদিমপুর গ্রামের যুক্তরাজ্য প্রবাসী হাজেরা আলী পান্নার জায়গা দখলের পাঁয়তারা চলে। এর অংশ হিসেবে ৩৫ লাখ টাকা চাঁদা দাবির অভিযোগ উঠে যুক্তরাজ্য প্রবাসী গোলাম রব্বানি সুহেলের বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় ভুক্তভোগী পরিবার সুহেলের বিরুদ্ধে ওসমানীনগর থানায় একটি মামলা দায়ে করেন। মামলার ঘটনাকে কেন্দ্র করে শটগান নিয়ে প্রকাশ্যে হুমকি,গুলি বর্ষণ ও দফায় দফায় ভুক্তভোগীর বাড়ি ভাঙচুরের অভিযোগ উঠে সুহেলের উপর। ভাংচুর ও লুটপাটের ঘটনায় সুহেলের বিরুদ্ধে আরো দুটি মামলা দায়ের হয়।
সর্বশেষ গত ১২ জুন একটি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে একটি ভিডিও শেয়ার করা নিয়ে শুরু হয় নতুন ফাঁদ। এই ফাঁদের ঘটনায় বহিরাগত লোকদের আনা হয় গ্রামে। চলে অস্ত্রের মহড়া। ভাইরাল ভিডিও কে কেন্দ্র করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পরে পুরো গ্রামে। এ সময় গ্রামবাসীর একটি অংশ সুহেলের বাড়ীতে গিয়ে অস্ত্রসহ কিছু বহিরাগতদের উপস্থিতি লক্ষ্য করেন। সেখান থেকেই একত্রিত গ্রামবাসী সুহেলের বাড়ী ভাংচুর করে ভাড়া করা শতাধিক সন্ত্রাসীর মধ্যে ১১ সন্ত্রাসীকে আটক করে পুলিশে সোপর্দ করেন।
পরে পুলিশ ও সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপে ওসমানীনগর উপজেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক রায়হান আহমদ ও উপজেলা যুবদলের সিনিয়র যুগ্ন আহবায়ক আহবাবুল হোসাইনের মধ্যস্থতায় পরিস্থিতি শান্ত হয়। কিন্তু অদৃশ্য কারণে ঘটনা মোড় নেয় অন্যদিকে। পুলিশ অভিযানকালে অভিযুক্ত সুহেলের বাড়ি থেকে কোন সন্ত্রাসী ও অস্ত্র উদ্ধার না করে পাল্টা গ্রামের সাবেক ইউপি সদস্য ও ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক জিতু মিয়া, যুক্তরাজ্য প্রবাসী আখলাক মিয়া, শানুর মিয়া ও জিতু মিয়াকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে আসে। এ ঘটনায় ওইদিনই সুহেলের ভাই গোলাম কিররিয়া জুয়েল এর স্ত্রী ডলি বেগম বাদী হয়ে ২১ জনের নাম উল্লেখ করে দ্রুত বিচার আইনে মামলা রুজু করে। সে সময় সাংবাদিকদের কাছে জনতার হাতে আটক হওয়া ১১ জনের নাম পরিচয় প্রকাশ করে নি পুলিশ।
এদিকে গত (১৬ জুন) হাজেরা আলী পান্নার বাড়ির কেয়ারটেকার কামাল হোসেন শটগান দিয়ে প্রকাশ্যে হুমকি,গুলি বর্ষণ ৫ দফা বাড়ী ভাংচুর ও লুটপাটের ঘটনায় অভিযুক্ত প্রধান আসামী গোলাম রব্বানী সুহেলকে দ্রুত গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়ে সিলেটের ডিআইজি ও পুলিশ সুপারের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন।
কে এই গোলাম রব্বানী সুহেল
পুরো নাম গোলাম রব্বানি সুহেল। এলাকায় যিনি সুহেল লন্ডনী নামে পরিচিত। ক্ষমতার দাপট ও কড়ি-কড়ি টাকার প্রভাবে যার বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিতে হাত কাঁপে প্রশাসনের। তিনি যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের একজন অর্থ যোগানকারী হিসেবে গুঞ্জন রয়েছে। যে কারণে কাড়ি কাড়ি টাকা, পেশি শক্তি, অস্ত্র ও স্থানীয় প্রশাসনও বরাবর অনুকুলে থাকে সুহেলের। গ্রামের একাধিক ব্যক্তির সাথে দীর্ঘ দিন ধরে জোড়পুর্বক জায়গা দখল নিয়ে বিরোধ রয়েছে সুহেলের। বিরোধ নিরসনে গ্রামে বসে শালিস বৈঠক। তবে বৈঠকে কৃতকর্মের অপরাধ হিসেবে শালিসে তিরস্কৃত হন তিনি। এতে গ্রামবাসীর উপর ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেন গোলাম রব্বানি সুহেল। সুহেলের বিরুদ্ধে গ্রামে একাধিক ব্যক্তির জায়গা দখলের অভিযোগ আছে। এসব ঘটনায় দায়ের করা মামলায় তাকে প্রধান আসামী করা হলেও কার্যকর পদক্ষেপ নেই প্রশাসনের। উপজেলার কতিপয় রাজনৈতিক নেতাকর্মী ও স্থানীয় প্রশাসন সুহেলকে পরোক্ষভাবে সহযোগিতা করার অভিযোগ করেছেন এলাকাবাসী।
সুহেলকাণ্ডে যুবদল নেতা বহিস্কার
জিঘাংসার অংশ হিসেবে উপজেলা যুবদলের সিনিয়র যুগ্ন আহবায়ক আহবাবুল হোসাইনকে জড়িয়ে সামাজিক সোশ্যাল মিডিয়া ও কিছু গণমাধ্যমে অপপ্রচার চালানো হলে ঘটনায় মধ্যস্ততাকারী আহবাবুল হোসাইনকে দলটি কোন কারণ দর্শানোর নোটিশ না দিয়ে সরাসরি বহিস্কার করে। এ ঘটনায় দলটির মধ্যেও রয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া।
বহিস্কৃত যুবদল নেতা আহবাবুল হোসাইন জানান,সন্ত্রাসী গোলাম রব্বানির বিরোধ এলাকার একাধিক ব্যক্তির সাথে। আমি সেই গ্রামের বাসিন্ধা হওয়ার ফলে বিষয়টি নিরসনে ইলিয়াসপন্থী তাহসিনা রুশদির লুনা নির্দেশ দিয়েছিলেন,আমি সেই নির্দেশ পালন করার অপরাধে আমাকে বহিস্কার করা হয়েছে। তবে তাহসিনা রুশদির লুনা বলেছেন ভিন্ন কথা,তিনি বলেন অন্য একটি বিষয়ে তাকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। তবে এ বিষয়ে নয়।
যুক্তরাজ্য প্রবাসী অভিযুক্ত গোলাম রব্বানী সুহেল বলেন, হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে গ্রামের প্রবিণ ৩/৪জন ব্যক্তির জোয়া খেলার ভিডিও প্রবাস থেকে এক ব্যক্তি শেয়ার করলে ভিডিওর নিচে আমি সচেতনতা মূলক মন্তব্য করি। সেই মন্তব্যকে কেন্দ্র করে সংঘবদ্ধ হয়ে আমার বাড়িতে হামলা চালিয়ে ভাংচুর ও লোটপাট করা হয় বলে তিনি দাবি করেন।
অতিরিক্তি পুলিশ সুপার ওসমানীনগর সার্কেল আশরাফুজ্জামান পি.পি এম বলেন, বর্তমানে পরিস্থিতি শান্ত রয়েছে। ঘটনার দিন আটক ১৫ জনের বিরুদ্ধে আইনী ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। গোলাম রব্বানী সুহেলের বিরুদ্ধে পূর্বে দায়ের করা মামলাও তদন্তাধীন।
এ ব্যাপারে সিলেটের পুলিশ সুপার মো: মাহবুবুর রহমান জানান, গোলাম রব্বানী সুহেলকে গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়ে লিখিত অভিযোগের বিষয়টি খুঁজে দেখবেন এবং বিষয়টি স্থানীয় ওসি সাহেবের সাথে কথা বলার পরামর্শ দেন।
নীরব চাকলাদার
মন্তব্য করুন: