সুনামগঞ্জে বিদায়ী শিক্ষা কর্মকর্তার ‘দুর্নীতি উৎসব’: শিক্ষা খাতের কোটি টাকা লোপাট
Led Bottom Ad

সুনামগঞ্জে বিদায়ী শিক্ষা কর্মকর্তার ‘দুর্নীতি উৎসব’: শিক্ষা খাতের কোটি টাকা লোপাট

নিজস্ব প্রতিনিধি,সুনামগঞ্জ

২৮/০৪/২০২৬ ১৬:০৮:৪৮

প্রধান উপদেষ্টা পদত্যাগ করবেন না: ফাইজ তাইয়েব আহমেদ

লাবন্যময় এক মুখশ্রী। নাম জাহাঙ্গীর আলম। নামের সাথে চেহাড়ার মিল রয়েছে পুরোপুরি। নাম আর চেহাড়ার অপূর্ব মিল দেখিয়েছেন তিনি কর্মস্থলে। সুনামগঞ্জ জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার হিসেবে কর্মরত থেকে দাপট দেখিয়েছেন নয় বছর। এই নয় বছরে আকণ্ঠ ছিলেন দুর্নীতিতে নিমজ্জিত। দীর্ঘ নয় বছর ধরে চলা দুর্নীতি ও অনিয়মের বেড়াজাল থেকে অবশেষে মুক্তি মিলেছে। সম্প্রতি জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার মো. জাহাঙ্গীর আলমের বদলি হওয়ায় পুরো জেলাজুড়ে শিক্ষক ও সংশ্লিষ্ট মহলে স্বস্তির নিঃশ্বাস বইছে। তবে বদলি হওয়ার প্রাক্কালে তার বিরুদ্ধে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ ও ক্ষমতার অপব্যবহারের যে চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে এসেছে, তা রীতিমতো স্তম্ভিত করার মতো।


অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০১৭ সালে সুনামগঞ্জে যোগদানের পর থেকে জাহাঙ্গীর আলম জেলা কার্যালয়কেই নিজের স্থায়ী বাসভবনে রূপান্তর করেন। সরকারি নিয়মনীতি তোয়াক্কা না করে বছরের পর বছর তিনি সরকারি বাসা ভাড়ার ভাতা গ্রহণ না করে অফিসেই বসবাস করে আসছেন।


​২০২৪ সালের মাঝামাঝি সময়ে জেলা শিক্ষা অফিসারের পাশাপাশি অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে আরও ৯টি উপজেলার মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তার দায়িত্ব পান তিনি। এরপরই তার দুর্নীতির পরিধি আকাশচুম্বী হয়। বিভিন্ন উপজেলার শিক্ষক প্রশিক্ষণ, শিক্ষা দিবস উদযাপন, আসবাবপত্র কেনা এবং স্টেশনারি খাতের বরাদ্দকৃত লক্ষ লক্ষ টাকা তিনি ভুয়া ভাউচার প্রদর্শন করে আত্মসাৎ করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।


প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রতিটি উপজেলায় শিক্ষা দিবস উদযাপনের জন্য ১ লাখ ২০ হাজার টাকা বরাদ্দ থাকলেও, জাহাঙ্গীর আলম তা নামকাওয়াস্তে কেবল একটি ব্যানারের পেছনে ব্যয় করে বাকি অর্থ পকেটস্থ করেছেন। তাহিরপুর উপজেলা হিসাব রক্ষণ অফিস থেকে প্রাপ্ত তথ্যমতে, গত ফেব্রুয়ারিতে শিক্ষা দিবসের নামে ১ লাখ ১৪ হাজার ৫০০ টাকা উত্তোলন করা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে সেখানে কোনো অনুষ্ঠান হয়নি, কেবল একটি ব্যানারের সামনে দাঁড়িয়ে ফটোসেশন করেই দায় সারা হয়েছে।


​শাল্লা উপজেলার এক শিক্ষক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আমাদের প্রশিক্ষণের নির্ধারিত ভাতা থেকে টাকা কেটে রাখা হয়েছে। ৯০ টাকার বিরিয়ানি খাইয়ে ভাউচার দেখানো হয়েছে ২৫০ টাকার। উন্নয়ন খাতের অর্থ এভাবে হরিলুট করা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।


নিজের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে বদলিকৃত কর্মকর্তা মো. জাহাঙ্গীর আলম কোনো সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা না দিয়ে বরং দায়সারাভাবে বলেন, আমি মাফ চাই, ক্ষমা চাই। যাওয়ার বেলায় এসব করবেন না। আমি যা করেছি মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে করেছি। কোনো দুর্নীতি করিনি। তার এই বক্তব্যে দুর্নীতি ঢাকতে মন্ত্রণালয়ের দোহাই দেওয়ার বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে বলে মনে করছেন সচেতন মহল।


দীর্ঘ সময় ধরে একজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে এহেন কর্মকাণ্ডে সুনামগঞ্জের মাধ্যমিক শিক্ষাঙ্গনের সুনাম ক্ষুণ্ন হয়েছে। দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত সরকারি এই টাকা উদ্ধারের পাশাপাশি তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্ত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন জেলার শিক্ষক ও সচেতন নাগরিক সমাজ।


​নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক শিক্ষক জানিয়েছেন, জাহাঙ্গীর আলমকে নিয়ে নিউজ না করতে তাকে নানাভাবে অনুরোধ করা হয়েছে, যা ইঙ্গিত দেয় যে তিনি তার দুর্নীতির জাল অনেক গভীরে বিস্তার করেছিলেন।


​সুনামগঞ্জের মাধ্যমিক শিক্ষাঙ্গনের এই ক্ষত নিরাময়ে এবং ভবিষ্যতে যেন কোনো কর্মকর্তা সরকারি অর্থ এভাবে তছরুপ করতে না পারেন, সেজন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবিলম্বে একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠনের আহ্বান জানানো হচ্ছে।


প্রীতম দাস

মন্তব্য করুন:

Led Bottom Ad
Led Bottom Ad