সিসিক নির্বাচন
ত্রিধারায় বিভক্ত সিলেট বিএনপি, বলয়কেন্দ্রিক লড়াইয়ে চাঙ্গা বিরোধীরা
নির্বাচনের দিনক্ষণ ঠিক না হলেও সিসিক নির্বাচন নিয়ে সব দলগুলোরই উৎসুক দৃষ্টি। দলীয় প্রার্থী হতে একাধিক প্রার্থী মাঠে কাজ করছেন দীর্ঘদিন থেকে। একইসাথে তাদের পক্ষে প্রচার-প্রচারণাও চলছে সমানতালে। নির্বাচনকে সামনে রেখে স্বতন্ত্র্য হিসেবে প্রার্থী হতে চাইছেন অনেকেই। রয়েছেন একাধিক প্রবাসীও। তবে দলীয়ভাবে একমাত্র জামায়াতে ইসলাম রয়েছে সুবিধাজনক অবস্থানে। দলীয় প্রার্থী চূড়ান্ত করে পুরোদমে মাঠে কাজ করছে দলটির নেতাকর্মীরা। মেয়র প্রার্থী হিসেবে জাতীয় পার্টি এখনও নিশ্চুপ। তবে ক্ষমতাসীন বিএনপির পক্ষে অন্তত ১০ থেকে ১২ জন প্রার্থীর নাম শোনা যাচ্ছে জোড়েসুরে। একাধিক প্রার্থীর দৌড়ঝাঁপ থাকায় দলটিতে কোন্দল এখন মাথাছাড়া দিয়ে উঠেছে। দলটিতে চলছে বলয়কেন্দ্রিক রাজনীতি। যুক্ত হয়েছে নেতাদের আধিপত্য বিস্তারের লড়াই। কেন্দ্র থেকে তৃণমূল—সর্বত্র এখন ক্ষমতার টানাপোড়েন।
একক কোনো প্রার্থী এখনো ঠিক হয়নি। একাধিক নেতা নিজের অনুসারীদের নিয়ে আলাদা বলয় গড়ে তুলেছেন। ফলে অনিশ্চয়তা ও বিবাদে পড়েছে দলটি। এই সুযোগে ভোটের মাঠে সুবিধাজনক অবস্থানে পৌঁছে যাচ্ছে বিরোধী দলগুলো।
মাঠে সবচেয়ে গোছানো অবস্থান দেখা যাচ্ছে জামায়াতে ইসলামীর। কোনো দ্বিধাদ্বন্দ্ব ছাড়াই তারা একক প্রার্থী ঘোষণা করেছে। ড. নূরুল ইসলাম বাবুলকে প্রার্থী করে মাঠে নেমেছে তারা। তৃণমূলের কর্মীদের নিয়ে জোরকদমে চলছে তাদের প্রচারণা। অন্যদিকে জাতীয় পার্টি এখনো নীরব ভূমিকা পালন করছে। অন্যান্য দলগুলোও ধীরে চলো নীতিতে এগোচ্ছে। ঠিক এই সময়ে বিপরীত মেরুতে রয়েছে বিএনপি। তাদের ভেতরে চলছে পদপদ্ধতি ও প্রভাব বিস্তারের রাজনীতি।
এক সময় সিলেটের বিএনপির রাজনীতিতে দুটি ধারা ছিল। একপক্ষে ছিলেন খন্দকার আবদুল মুক্তাদির। অন্যপক্ষে ছিলেন আরিফুল হক চৌধুরী। কিন্তু নতুন রাজনৈতিক সমীকরণে আবির্ভাব ঘটে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবিরের। তিনি সিলেটে নিজের একটি স্বতন্ত্র বলয় গড়ে তোলতে মরিয়া। তাঁর এই বলয়কেন্দ্রীক রাজনীতির প্রকাশ ঘটে চলতি বছরের জাতীয় নির্বাচনের সময়। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর এই বলয়ে কয়েকজন সংসদ সদস্যের সমর্থন রয়েছে। ফলে আগে দুই ধারায় বিভক্ত বিএনপি এখন প্রকাশ্যেই ত্রিধাবিভক্ত।
বিএনপির নেতাকর্মীদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, সিলেটে বলয় কেন্দ্রীক রাজনীতিতে শক্তিশালী এখন খন্দকার মুক্তাদির বলয়। বিশেষ করে সম্প্রতি অনুমোদিত দলের জেলা ও মহানগর যুবদলের কমিটিতে এই বলয়ের প্রভাব আরও স্পষ্ট হয়ে উঠে। তাছাড়া, সহযোগী সংগঠনের শীর্ষ নেতারাও এই বলয়ের অনুসারী। তবে হুমায়ুন কবির বলয়ও ভিন্ন কৌশলে সিলেটে শক্তিশালী আধিপত্য দেখাতে মরিয়া। এরই অংশ হিসেবে এই বলয়ে যুক্ত হয়েছেন বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সহ সাংগঠনিক সম্পাদক মিফতাহ সিদ্দিকী। তিনি সিলেটের তৃণমূল নেতাকর্মীদের কাছে বেশ জনপ্রিয় থাকায় ধীরে ধীরে বাড়ছে বলয়ের আধিপত্য। আরিফুল হকের অনুসারীরাও মাঠ ছাড়তে রাজি নন। যদিও দলের জেলা ও মহানগরের অধিকাংশ নেতার সাথে সম্পর্ক ভালো নেই আরিফুল হকের। এই বলয় থেকে একক মেয়র প্রার্থী হিসেবে রয়েছেন দলের জেলা বিএনপির প্রথম যুগ্ম-সম্পাদক ইশতিয়াক আহমেদ সিদ্দিকী। অপরদিকে দলের হয়ে একমাত্র মহিলা মেয়র প্রার্থী হিসেবে নাম শোনা যাচ্ছে কেন্দ্রীয় মহিলা দলের সাবেক সহ-সভাপতি সামিয়া বেগম চৌধুরীর। তিনি কেন্দ্রীয় মহিলা দলের আশির্বাদ নিয়ে এবার মাঠে নামার পুরো প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
ফলে সিলেটে বিএনপির রাজনৈতিক প্রভাব বজায় রাখার এই লড়াই এখন তীব্র। এই তিন বলয় থেকেই অন্তত ১০ জন নেতা মেয়র পদের জন্য দৌড়ঝাঁপ করছেন। ফলে বেড়েছে কোন্দলও।কোন্দলের প্রভাব মারাত্মক রূপ নিয়েছে জেলা ও নগর নেতৃত্বের দূরত্বে। গত ২২ ফেব্রুয়ারি মহানগর কমিটিকে পাশ কাটানো হয়। জেলা বিএনপির সভাপতি আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরীকে সিসিকের প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়। এর পেছনে মুক্তাদির বলয়ের প্রশাসনিক প্রভাবকে দায়ী করছেন নগর নেতারা। তাঁদের আশঙ্কা, এই সুযোগে মেয়র পদে কাইয়ুম চৌধুরীকেই চূড়ান্ত করা হতে পারে। এতে নগর বিএনপিতে চরম ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।
ক্ষমতার এই লড়াই প্রকাশ্যে আসে রাষ্ট্রপতির সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে। অভিযোগ উঠেছে, সিসিক প্রশাসক কাইয়ুম চৌধুরী একাই কৃতিত্ব নেওয়ার চেষ্টা করেন। সংবর্ধনায় সার্বিক সমন্বয়হীনতা স্পষ্ট ছিল। রাষ্ট্রপতির বহরে অনুমোদিত গাড়ি প্রবেশেও বাধা দেওয়া হয়। এই আধিপত্যের প্রতিবাদে নগর বিএনপির বড় একটি অংশ অনুষ্ঠান বর্জন করে। এ ছাড়া নতুন নগর কার্যালয় উদ্বোধনেও সিসিক প্রশাসকসহ শীর্ষ প্রার্থীরা উপস্থিত ছিলেন না। এতে ভেতরের দূরত্ব আরও পরিষ্কার হয়ে ওঠে।
মনোনয়ন লড়াইয়ে মুক্তাদির বলয় থেকে বেশ কজন এগিয়ে আছেন। তাঁরা হলেন সিসিক প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী, মহানগর সভাপতি নাছিম হোসেইন, সিলেট উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রেজাউল হাসান কয়েছ লোদী, সাধারণ সম্পাদক এমদাদ হোসেন চৌধুরী ও যুবদল নেতা হাজী দেলোয়ার হোসেন দিনার।
হুমায়ুন কবির বলয় থেকে লড়ছেন ওয়াসার চেয়ারম্যান মিফতাহ সিদ্দিকী। আরিফুল হক বলয় থেকে মাঠে আছেন ইশতিয়াক আহমদ সিদ্দিকী। আর বলয়ের বাইরে আছেন বদরুজ্জামান সেলিম ও একমাত্র নারী প্রার্থী অধ্যাপক সামিয়া বেগম চৌধুরী।
সম্প্রতি দলীয় সভায় কেন্দ্রীয় নেতাদের সামনে ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন তৃণমূল কর্মীরা। এর থেকে স্পষ্ট, কোন্দল এখন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিএনপি যখন নিজেদের প্রভাব বিস্তারে ব্যস্ত, প্রতিপক্ষ তখন ভোটব্যাংক গুছিয়ে নিচ্ছে। সময় থাকতে বলয়কেন্দ্রিক রাজনীতি বন্ধ না হলে সিসিক নির্বাচনে বিএনপিকে বড় মাশুল গুণতে হতে পারে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে দলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক মিফতাহ সিদ্দিকী বলেন,আমি বলয় কেন্দ্রীক রাজনীতিতে বিশ্বাসী নই। জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক আদর্শে উজ্জীবিত একজন কর্মি হিসেবে দলীয় প্রধান তারেক রহমান আমার নেতা। দলীয় প্রধান এবং দলীয় আদর্শ মেনে চলাই আমার আগামীর রাজনীতির পাথেয়।
নীরব চাকলাদার
মন্তব্য করুন: