৮ মাসেই প্রাণ গেল ১৯ জনের!
হবিগঞ্জে রক্তক্ষয়ী সংঘাতের ‘মহোৎসব’: তুচ্ছ কাণ্ডেই রণক্ষেত্র
সামান্য কারণে কথা-কাটাকাটি, বাঁশঝাড়ের সীমানা কিংবা মসজিদের ভেতর কথা বলাকে কেন্দ্র করে একে অপরের দিকে দেশীয় অস্ত্র নিয়ে তেড়ে যাওয়া যেন এখন হবিগঞ্জের সাধারণ ‘রেওয়াজ’! তুচ্ছ ঘটনা, গোষ্ঠীগত বিরোধ আর মোড়লগিরির সামাজিক প্রভাব দেখাতে গিয়ে জেলার আনাচে-কানাচে অহরহ জমজমাট রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের আয়োজন চলছে। রামদা, বল্লম, টেঁটা আর লাঠিসোটা নিয়ে পুরো এলাকাকে যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত করে ঘরবাড়ি ভাঙচুর ও লুটপাট চালানো যেন এখানকার অন্যতম ‘জনপ্রিয় গ্রামীণ খেলা’!
এটি আর কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং হবিগঞ্জের নিত্যদিনের রেওয়াজে পরিণত হয়েছে। কোনো কারণ ছাড়াই ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া আর রক্তাক্ত হওয়ার প্রতিযোগিতায় প্রশ্ন উঠছে—হবিগঞ্জের মানুষের গায়ে এত রক্তের গরম কেন? সামান্য কথাতেই বা কেন রামদা নিয়ে ছুটতে হবে?
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দেওয়া তথ্যের দিকে তাকালে আঁতকে ওঠার বদলে কপালে হাত দিয়ে বসা ছাড়া উপায় থাকে না। ২০২৫ সালের পুরো ১২ মাসে জেলাটিতে ৯৫টি ছোট-বড় ‘দাঙ্গা সংঘর্ষের প্রদর্শনী’ হয়েছিল, যাতে রক্ত ঝরেছিল ১ হাজার ১৯৯ জনের এবং প্রাণ হারিয়েছিলেন ১৯ জন।
তবে সেই রেকর্ড ভেঙে নতুন ইতিহাস গড়ার প্রতিযোগিতায় নেমেছে ২০২৬ সাল! এই বছরের মাত্র প্রথম আট মাসেই সংঘর্ষের সেঞ্চুরি পার হয়ে সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১০৪টিতে! এতে এরই মধ্যে ৮৬০ জন রক্তাক্ত হয়ে হাসপাতালে গেছেন এবং গত বছরের পুরো ১২ মাসের মোট মৃত্যুর রেকর্ড ভেঙে মাত্র ৮ মাসেই ১৯ জন পরপারে পাড়ি জমিয়েছেন। রক্তক্ষয়ী এই খেলায় অসংখ্য মানুষ স্থায়ী পঙ্গুত্ব বরণ করে ঘরে বসেছেন।
স্থানীয়দের মতে, আগে গাঁয়ের কোনো প্যাঁচ বা ঝগড়া সামাজিক সালিশে বয়স্ক মুরুব্বিদের এক ধমকেই মিটে যেত। কিন্তু এখন সেই মুরুব্বিদের কথায় কেউ কান দেওয়ার প্রয়োজনই বোধ করে না! বরং গোষ্ঠীগত অহংকার আর মাতব্বরি ফলানোর তীব্র তাগিদে অহেতুক ঘটনায় অস্ত্র হাতে রাস্তায় নেমে পড়াই এখন ট্রেন্ড।
এদিকে জনশুমারি ২০২২-এর হিসাব বলছে, জেলার ২৩ লাখের বেশি জনসংখ্যার মধ্যে প্রায় এক লাখ ৮৭ হাজার তরুণের প্রায় ৩৯ শতাংশই কোনো পড়ালেখা, কাজ কিংবা প্রশিক্ষণের মধ্যে নেই। সোজা কথায়, কোনো কাজকাম না থাকা এই বিশাল বেকার তরুণ বাহিনী এখন এলাকায় ক্ষমতা দেখানো ও রামদা হাতে মিছিলে যোগ দেওয়ার আদর্শ ‘ফ্রি এজেন্ট’!
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর জেলা সভাপতি অ্যাডভোকেট ত্রিলোক কান্তি চৌধুরী বিজন দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, "আগে সমাজে মুরুব্বিদের প্রতি যে শ্রদ্ধা আর ভয়টা ছিল, তা এখন উবে গেছে। এখন সবাই জাঁদরেল নেতা বা মস্তান হতে চায়। সমাজ আর রাজনীতি মিলে এখনই কঠোর লাগাম না টানলে শুধু পুলিশ দিয়ে এই রামদা বাহিনী থামানো সম্ভব না।"
জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট মঞ্জুর উদ্দিন আহমেদ শাহীনও ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "পবিত্র মসজিদের ভেতরে নামাজের কাতার বা কথা বলা নিয়ে পর্যন্ত মারামারি হচ্ছে! এর চেয়ে লজ্জার আর কী হতে পারে? দ্রুত মানসিক চিকিৎসা আর সামাজিক উদ্যোগ না নিলে সামনে আরও ভয়াবহ দিন দেখতে হবে।"
এদিকে হবিগঞ্জের পুলিশ সুপার তারেক মাহমুদ অবশ্য আশ্বাস দিয়ে জানিয়েছেন, পুলিশ এখন এলাকায় এলাকায় ‘ব্লক রেইড’ দিয়ে দেশীয় অস্ত্রের গোডাউন খালি করার অভিযানে নেমেছে। পাশাপাশি মানুষকে কিছুটা স্বাভাবিক করার চেষ্টা চালানো হচ্ছে।
তবে সাধারণ মানুষের মতে, সমাজ, পরিবার আর জনপ্রতিনিধিরা যদি যুবসমাজকে রামদা ছেড়ে কাজে না লাগাতে পারেন, তবে কেবল পুলিশের বাঁশি শুনে হবিগঞ্জের এই ‘বার্ষিক রক্তক্ষয়ী সংঘাত উৎসব’ থামানো এক কথায় অসম্ভব!
নীরব চাকলাদার
মন্তব্য করুন: