যে আইনে আ.লীগের বিচার, হতে পারে নিষিদ্ধ
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনের আওতায় মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে। তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হলে দলটির কার্যক্রম নিষিদ্ধ, নিবন্ধন বাতিল এবং সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার সুযোগ রয়েছেযে বিধান আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ই আইনে যুক্ত হয়েছিল। ফলে নিজেদের প্রণীত আইনের আওতায়ই দলটির বিচার ও সম্ভাব্য নিষিদ্ধ হওয়ার প্রশ্ন সামনে এসেছে।দল হিসেবে আওয়ামী লীগের বিচারের জন্য জুলাই অভ্যুত্থানে মানবতাবিরোধী অপরাধসহ বিভিন্ন অভিযোগের তদন্ত চলছে বলে জানিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম।
তিনি বলেন, তদন্তে সত্যতা মিললে বিচারে আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের পাশাপাশি দলটির সব সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার সুযোগ রয়েছে ট্রাইব্যুনাল আইনে।
ট্রাইব্যুনালসংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, ১৯৭৩ সালে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারই প্রণয়ন করে। ২০১৩ সালে ২ নম্বর ধারা সংশোধন করে ‘অরগানাইজেশন’ বা ‘সংগঠন’ শব্দটি যুক্ত করে আওয়ামী লীগই। এখন এই আইনেই রাজনৈতিক দল হিসাবে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের লক্ষ্যে এগোচ্ছে বর্তমান সরকার। অর্থাৎ আওয়ামী লীগের করা আইনেই ফেঁসে যাচ্ছে আওয়ামী লীগ।
আইনজ্ঞরা বলেছেন, জার্মানিসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন নাৎসি বাহিনী নৃশংস অত্যাচার চালিয়েছিল। ১৯৪৫-৪৬ সালে নুরেমবার্গ ট্রাইব্যুনালে নাৎসি নেতৃত্ব ও বাহিনীর বিচার করা হয়, যা আন্তর্জাতিক আইনের ইতিহাসে একটি মাইলফলক। তারা বলেন, বিদ্যমান ট্রাইব্যুনাল আইনেই আওয়ামী লীগের বিচার করা সম্ভব। বিচারে অপরাধ প্রমাণিত হলে নিষিদ্ধ হতে পারে দলটি। তবে কেউ কেউ বলেছেন, এই বিচারের পেছনে ভিন্ন উদ্দেশ্য থাকতে পারে। তাদের মতে, আওয়ামী লীগকে রাজনৈতিকভাবে চাপে রাখতে অথবা নির্বাচন থেকে দূরে রাখতেই এই বিচারের আয়োজন।
রাজনৈতিক দল হিসাবে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের তদন্ত চলমান আছে বলে জানিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার সমন্বয়ক (কো-অর্ডিনেটর) আনসার উদ্দিন খান পাঠান। তিনি বুধবার যুগান্তরকে বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় রাজনৈতিক দল হিসাবে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ এনে ট্রাইব্যুনালে আবেদন করেছিল জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক আন্দোলন (এনডিএম)। আবেদনটি তদন্ত সংস্থায় আসার পর সংস্থার একটি টিম তদন্ত কার্যক্রম শুরু করেছে। স্বাধীন বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের দ্বারা যত অপরাধ কর্মকাণ্ড হয়েছে তার তদন্ত হচ্ছে। তিনি বলেন, বিষয়টি অত্যন্ত স্পর্শকাতর, আমরা গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করছি। কবে নাগাদ তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, অনেক দিনের ঘটনা, একটু সময় লাগতে পারে।
৮ এপ্রিল সন্ত্রাসী কার্যক্রমে জড়িত ব্যক্তি বা সত্তার কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ করার বিধান যুক্ত করে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জারি করা সন্ত্রাসবিরোধী (সংশোধন) অধ্যাদেশ অনুমোদন করে জাতীয় সংসদ। অন্যদিকে ২০২৫ সালের ১০ মে আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইন সংশোধন করে অধ্যাদেশ জারি করে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। এতে কোনো রাজনৈতিক দল, তার অঙ্গসংগঠন বা সমর্থক গোষ্ঠীকে শাস্তি দিতে পারবেন ট্রাইব্যুনাল।
আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইন সংশোধন করে জারি করা অধ্যাদেশে বলা হয়েছে, ‘এই আইন বা প্রযোজ্য অন্যান্য আইনে যা কিছুই থাকুক না কেন, যদি ট্রাইব্যুনালের কাছে প্রতীয়মান হয় যে- কোনো সংগঠন এই আইনের ৩ ধারা উপধারা (২)-এর অধীন কোনো অপরাধ সংঘটন করেছে, আদেশ দিয়েছে, চেষ্টা করেছে, সহায়তা করেছে, উসকানি দিয়েছে, মদদ দিয়েছে, ষড়যন্ত্র করেছে, সহযোগিতা করেছে অথবা অন্য যে কোনোভাবে সেই অপরাধ সংঘটনে সহায়তা করেছে, তবে ট্রাইব্যুনালের ক্ষমতা থাকবে সংগঠনটির কার্যক্রম স্থগিত বা নিষিদ্ধ করার, সংগঠনের নিষিদ্ধ ঘোষণা, এর নিবন্ধন বা লাইসেন্স স্থগিত অথবা বাতিল করার এবং এর সম্পত্তি জব্দ করার।’ আইনে সংগঠন শব্দটির সংজ্ঞায়নও করা হয়েছে। এই আইনের আওতায় সংগঠন বলতে যে কোনো রাজনৈতিক দলকেও বোঝাবে। পাশাপাশি দলের অধীন, সম্পর্কিত বা সংশ্লিষ্ট কোনো সংগঠন অথবা গোষ্ঠীকে বোঝাবে।
সজল আহমেদ
মন্তব্য করুন: