উদ্বোধনের ছয় বছরেও অচল শ্রীমঙ্গল বিসিক শিল্পনগরী
চা–সমৃদ্ধ মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্প বিকাশের লক্ষ্য নিয়ে প্রায় ৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে ২০ একর জমির ওপর নির্মিত বিসিক শিল্পনগরী ছয় বছর ধরে পড়ে আছে অচল অবস্থায়। ২০১২ সালে প্রকল্পের কাজ শুরু হয়ে ২০১৯ সালে সব অবকাঠামো নির্মাণ শেষ হলেও এখনো সেখানে কোনো শিল্পকারখানা গড়ে ওঠেনি।
প্রকল্প এলাকায় প্রশাসনিক ভবন, কোয়ার্টার, পাম্প হাউস, গ্যাস সাবস্টেশন, পুকুর ও পিচঢালা সড়কসহ প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণ করা হয়। তবে উদ্বোধনের ছয় বছর পেরিয়ে গেলেও শিল্পনগরীতে কার্যক্রম শুরু হয়নি।
শিল্পনগরীর ১২২টি প্লটের মধ্যে ৫৬টি প্লট বরাদ্দ দেওয়া হলেও কোনো উদ্যোক্তা এখনো কারখানা স্থাপনের কাজ শুরু করেননি। নিরাপত্তার অভাব ও পর্যাপ্ত তদারকির ঘাটতিতে গ্যাস সাবস্টেশন ও বিদ্যুতের ট্রান্সফরমারসহ মূল্যবান সরঞ্জাম চুরি হয়ে গেছে। ফলে দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংযোগ বন্ধ রয়েছে।
স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানান, বিসিক শিল্পনগরীর উদ্দেশ্য ছিল স্থানীয় উদ্যোক্তাদের শিল্প স্থাপনে উৎসাহ দেওয়া। কিন্তু প্লটের দাম বেশি এবং প্রয়োজনীয় সুবিধা না থাকায় উদ্যোক্তারা আগ্রহ হারাচ্ছেন।
বিসিক সূত্রে জানা যায়, ২০১২ সালে উপজেলার উত্তরসুর এলাকায় ২০ একর জমি অধিগ্রহণ করে শিল্পনগরী নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ২০১৬ সালে নির্মাণকাজ শুরু হয়ে ২০১৯ সালে শেষ হয়। দীর্ঘদিন প্লট খালি পড়ে থাকায় ২০২৩–২৪ অর্থবছরের শেষ দিকে জেলার বাইরের কয়েকজন উদ্যোক্তার নামে ৫৬টি প্লট বরাদ্দ দেওয়া হয়। তবে এখনো কোনো শিল্প স্থাপনার কাজ শুরু হয়নি।
শিল্পনগরীতে তিন ধরনের প্লট রয়েছে। এ ক্যাটাগরির প্লটের আয়তন ৬০ বাই ১০০ ফুট, বি ক্যাটাগরির ৪৫ বাই ৯০ ফুট এবং এস ক্যাটাগরির প্লটের আয়তন ৩ হাজার ৮০০ থেকে ৮ হাজার ১০০ বর্গফুট। ৯৯ বছরের জন্য প্রতি বর্গফুটের মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৭৯৯ টাকা ৫১ পয়সা।
সম্প্রতি সরেজমিনে দেখা যায়, প্রশাসনিক ভবন ছাড়া শিল্পনগরীর প্রায় পুরো এলাকাজুড়ে জঙ্গল গজিয়েছে। পিচঢালা সড়ক ফেটে বের হয়েছে ঘাস ও গাছগাছালি। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা দ্বিতীয় প্রবেশপথটি গাছপালায় ঢেকে গেছে। খুঁটিতে কোনো ট্রান্সফরমার নেই। ভবনের ভেতরে পড়ে আছে খোলা যন্ত্রাংশ, আর মিটার ঢেকে গেছে লতাপাতায়। এলাকাটি এখন সাপ, বোলতা ও মৌমাছিসহ নানা প্রাণীর আবাসস্থলে পরিণত হয়েছে। দিনের বেলাতেও একা চলাচল করা কঠিন।
শ্রীমঙ্গল ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক কামাল মিয়া বলেন, শিল্পনগরীর প্লটের দাম আশপাশের এলাকার জমির তুলনায় অনেক বেশি। এর ওপর বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংযোগ বন্ধ থাকায় উদ্যোক্তারা নিরুৎসাহিত হচ্ছেন।
প্লট বরাদ্দ পাওয়া রাহুল গুড়া মসলার মালিক রঞ্জিত দাশ বলেন, কাজ শুরু করার ইচ্ছা থাকলেও বর্তমানে পর্যাপ্ত অর্থের অভাবে তা সম্ভব হচ্ছে না।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ব্যবসায়ী জানান, তিনি মৌলভীবাজার বিসিক শিল্পনগরীতে কারখানা স্থাপন করেছেন। শ্রীমঙ্গলে কারখানা নেওয়ার আগ্রহ থাকলেও প্লটের দাম বেশি এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থাও দুর্বল হওয়ায় ঝুঁকি নেননি।
শিল্পনগরীর নৈশপ্রহরী বিশ্বজিৎ সরকার বলেন, চারপাশে জঙ্গল হয়ে যাওয়ায় বিশাল এলাকা একা পাহারা দেওয়া অসম্ভব। ট্রান্সফরমার চুরির পর থেকে বিদ্যুৎ সংযোগ নেই। একাধিকবার চোর–ডাকাতের ঝুঁকির মুখেও পড়তে হয়েছে।
শ্রীমঙ্গল বিসিক শিল্পনগরীর কর্মকর্তা মো. মুনায়েম ওয়ায়েছ বলেন, ২০১৯ সালে বরাদ্দ দেওয়া ৫৬টি প্লটের কোনো উদ্যোক্তা এখনো কাজ শুরু করেননি। গত অক্টোবরের শেষ দিকে জেলা প্রশাসকের সঙ্গে সভায় সিদ্ধান্ত হয়েছে, ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে শিল্প স্থাপনের কাজ শুরু করতে হবে এবং বকেয়া পরিশোধ করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, ট্রান্সফরমার চুরি হওয়ায় বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে। পুনঃসংযোগের জন্য পল্লী বিদ্যুতকে জানানো হয়েছে। গ্যাস সাবস্টেশনের ক্ষতিগ্রস্ত অংশ পুনঃস্থাপনের ব্যয় নিরূপণ করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট দপ্তরের প্রতিবেদন পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বরাদ্দ পাওয়ার পরও যারা কাজ শুরু করেননি, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে।
নীরব চাকলাদার
মন্তব্য করুন: