পাহাড়ি ঢলের অজুহাত, তাহিরপুরে ফসলি জমি কেটে কালভার্ট ও খাল খনন
চারপাশে বিস্তীর্ণ ফসলি জমির মাঝেই বিটুমিনের পাকা সড়ক কেটে নির্মাণ করা হচ্ছে কালভার্ট। সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার সীমান্ত সড়কে এমন অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প হাতে নেওয়ায় সরকারি অর্থের অপচয়ের আশঙ্কায় ক্ষুব্ধ স্থানীয় বাসিন্দারা। অন্যদিকে, জমির ওপর দিয়ে খাল খনন করা হলে কৃষিজমি হারানোর শঙ্কা প্রকাশ করেছেন ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা।
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) সূত্রে জানা যায়, প্রায় ৪৩ কোটি টাকা ব্যয়ে তাহিরপুরের ট্যাকেরঘাট থেকে কড়ইগড়া বাজার পর্যন্ত প্রায় পাঁচ কিলোমিটার সীমান্ত সড়ক সংস্কার ও সম্প্রসারণের কাজ চলছে। ১২ ফুটের এই সড়কটি প্রশস্ত করে ১৮ ফুট করা হচ্ছে, যার দুই পাশে থাকবে ৩ ফুট করে মোট ৬ ফুটের শোল্ডার। এলজিইডির এই প্রকল্পের আওতায় পাঁচটি সেতু ও ১০টি কালভার্ট নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে, যার মধ্যে নতুন করে তিনটি কালভার্ট যুক্ত করা হয়। কাজটি বাস্তবায়ন করছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স চৌধুরী এন্টারপ্রাইজ ও মেসার্স নুর কনস্ট্রাকশন।
অনুসন্ধানে জানা যায়, সড়ক উন্নয়নের নামে এই প্রকল্পে অন্তত দুটি অপ্রয়োজনীয় কালভার্ট নির্মাণে খরচ হচ্ছে প্রায় ৮০ লাখ টাকা। স্থানীয়দের তীব্র সমালোচনার মুখে এর মধ্যে একটি কালভার্ট নির্মাণের সিদ্ধান্ত থেকে সরে এলেও বাকি দুটির নির্মাণকাজ চালিয়ে যাচ্ছে কর্তৃপক্ষ।
চানপুর গ্রামের বাসিন্দা ও উত্তর বড়দল ইউনিয়ন পরিষদের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক সদস্য মহিউদ্দিন বলেন, “যেখানে সড়ক কেটে নতুন কালভার্ট নির্মাণ করা হচ্ছে, সেখানে আগে কোনো পানিপ্রবাহের পথ ছিল না। এর কোনো প্রয়োজনই নেই। উল্টো বর্ষায় পাহাড়ি ঢলে আশপাশের ফসলি জমি ও বসতবাড়ির ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে।”
রাজাই গ্রামের বাসিন্দা দানিয়াল ম্রু ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “যে জায়গা দিয়ে নতুন খাল খনন করে পানি নেওয়ার কথা বলা হচ্ছে, সেটি আমাদের রেকর্ডভুক্ত ও খাজনা পরিশোধ করা ফসলি জমি। জমি কেটে খাল তৈরি করা হলে আমরা চিরতরে চাষাবাদ থেকে বঞ্চিত হব।”
সড়ক প্রশস্ত করতে গিয়ে স্থানীয়দের রেকর্ডভুক্ত জমির একটি অংশ অধিগ্রহণ না করেই জোরপূর্বক সড়ক প্রকল্পের আওতায় নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এতে এলাকার আদিবাসী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ দেখা দিয়েছে।
বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সাংগঠনিক সম্পাদক ও পরিবেশকর্মী এন্ডো জুয়েল সলোমার বলেন, “যাচাই-বাছাই ছাড়াই এবং আগে থেকেই সেতু থাকা সত্ত্বেও নতুন করে অপ্রয়োজনীয় কালভার্ট বানিয়ে সরকারি অর্থের অপচয় করা হচ্ছে। জমি অধিগ্রহণ না করেই ব্যক্তি মালিকানাধীন জমি, এমনকি বিভিন্ন মিশন, মাদ্রাসা ও চার্চের জমিও সড়কের পেটে চলে যাচ্ছে। বিষয়টি আমরা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার মাধ্যমে জেলা প্রশাসককে লিখিতভাবে জানিয়েছি।”
অপ্রয়োজনীয় কালভার্ট ও জমি অধিগ্রহণ সংক্রান্ত অভিযোগের বিষয়ে কথা বলতে গেলে তাহিরপুর উপজেলা প্রকৌশলী জাহিদুল ইসলাম দাবি করেন, ম্যাপ অনুযায়ী সড়কের জন্য ৪৮ ফুট জায়গা রয়েছে এবং সংস্কারের পর সড়কটি ২৬ ফুট প্রশস্ত হবে।
তিনি আরও বলেন, “স্থানীয়দের আপত্তির পর একটি কালভার্ট বাতিল করা হয়েছে। তবে বর্ষার আকস্মিক পাহাড়ি ঢলের পানির চাপে যাতে সড়ক ভেঙে না যায়, সে কারণেই পানি নিষ্কাশনের পথ হিসেবে বাকি দুটি কালভার্ট ও এর সামনে-পেছনে খাল খনন করা প্রয়োজন। পানির গতিপ্রবাহ ও ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি বিবেচনা করেই এটি করা হচ্ছে।”
শামসুল আলম আখঞ্জী/ নীরব চাকলাদার/ প্রসি-২০২৬
মন্তব্য করুন: